আন্তর্জাতিক ফুটবলে লিওনেল মেসির অধ্যায় শেষ হল এক আবেগঘন রাতের সাক্ষী হয়ে। বুয়েনস আয়ার্সের মনুমেন্তাল স্টেডিয়ামে বেনিনের বিরুদ্ধে ৩-০ ব্যবধানে জিতল আর্জেন্তিনা। নিজের শেষ আন্তর্জাতিক ম্যাচে মেসি শুধু গোলই করলেন না, সতীর্থকে গোল করিয়েও বিদায়ী রাতটিকে স্মরণীয় করে রাখলেন।
মাঠে তখন প্রায় ৮৫ হাজার দর্শক। গ্যালারিতে চোখে পড়ছিল বিশাল ‘Gracias Leo’ লেখা ১০ নম্বর জার্সি। পরিবারের সদস্যদের উপস্থিতি, সতীর্থদের আবেগ এবং দর্শকদের লাগাতার মেসি-মেসি ধ্বনিতে ম্যাচ শুরুর আগেই স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল, এটি শুধুই একটি আন্তর্জাতিক ম্যাচ নয়।
৩৯ বছর বয়সি মেসি তাঁর তিন সন্তান থিয়াগো, মাতেও এবং সিরোকে সঙ্গে নিয়ে মাঠে প্রবেশ করেন। জাতীয় সঙ্গীত চলাকালীন আবেগ ধরে রাখতে পারেননি আর্জেন্তিনার অধিনায়ক। একই ছবি দেখা যায় ডাগআউটে। কোচ লিওনেল স্কালোনিও ছিলেন আবেগপ্রবণ। গ্যালারিতে ছিলেন আর্জেন্তিনার প্রাক্তন তারকা অ্যাঞ্জেল দি মারিয়া এবং ফ্রান্সের বিশ্বকাপজয়ী প্রাক্তন ফুটবলার ডেভিড ত্রেজেগে।
ম্যাচ শুরুর আগে বেনিনের অধিনায়ক মেসির হাতে বিশেষ স্মারক ও একটি চিঠি তুলে দেন। এরপর ম্যাচের ১০ মিনিটে মেসিকে সম্মান জানাতে এক মিনিটের জন্য খেলা থামানো হয়। আতশবাজির আলোয় আলোকিত হয়ে ওঠে স্টেডিয়াম, আর গ্যালারি জুড়ে ধ্বনিত হয় ‘মেসি, মেসি’।
ম্যাচের শুরু থেকেই নিজের পরিচিত ছন্দে দেখা যায় মেসিকে। সপ্তম মিনিটেই বক্সের বাইরে সতীর্থের সঙ্গে ওয়ান-টু খেলে বাঁ পায়ের শট নিয়েছিলেন তিনি। তবে বেনিনের গোলরক্ষক সেই প্রচেষ্টা আটকে দেন।
বিরতির আগে দুই দলই গোলের সুযোগ তৈরি করে। ৪৩ মিনিটে জুলিয়ান আলভারেজ়ের শট প্রতিহত করেন বেনিনের গোলরক্ষক। অন্যদিকে বেনিনের জুনিয়র ওলাইতানের প্রচেষ্টাও আটকে দেন আর্জেন্তিনার গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্তিনেজ়।
প্রথমার্ধে প্রায় ৬৫ শতাংশ সময় বলের নিয়ন্ত্রণ আর্জেন্তিনার হাতে থাকলেও গোলের দেখা মেলেনি। ফলে গোলশূন্য অবস্থাতেই বিরতিতে যায় দুই দল।
দ্বিতীয়ার্ধ শুরু হতেই ম্যাচের চেহারা বদলে যায়। ৪৮ মিনিটে মেসির তৈরি করা সেট-পিস থেকেই আসে আর্জেন্তিনার প্রথম গোল। দুর্দান্ত ভলিতে বল জালে পাঠান অভিজ্ঞ ডিফেন্ডার নিকোলাস ওতামেন্দি।
জাতীয় দলের জার্সিতে নিজের বিদায়ী ম্যাচে গোল করার পর বেশিক্ষণ মাঠে থাকেননি ওতামেন্দি। কিছুক্ষণ পরেই তাঁকে তুলে নেওয়া হয়।
আর্জেন্তিনার দ্বিতীয় গোলটি যেন হয়ে উঠল ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে দেওয়া একটি বার্তা। ৬১ মিনিটে মেসির বাড়ানো বল বাঁ দিক থেকে নিয়ন্ত্রণে নিয়ে ভিতরে ঢোকেন তরুণ নিকো পাজ়। এরপর মেসিরই পরিচিত ভঙ্গিতে বাঁকানো শটে দূরপাল্লা থেকে বল জালে জড়িয়ে দেন তিনি।
মেসির পাস থেকে পাজ়ের সেই গোলকে প্রতীকী অর্থেও দেখা যায়। আর্জেন্তিনার ১০ নম্বর জার্সির ভবিষ্যৎ উত্তরসূরি হিসেবে যাঁকে ভাবা হচ্ছে, তাঁর পায়ে মেসির তৈরি করা সুযোগ থেকে গোল—বিদায়ী ম্যাচের আবেগকে আরও গভীর করে দেয়।
এরপর এল সেই মুহূর্ত, যার অপেক্ষায় ছিল গোটা মনুমেন্তাল। ৭১ মিনিটে বেনিনের বক্সে অগাস্টিন ফাউলের শিকার হলে পেনাল্টির সিদ্ধান্ত দেন রেফারি।
স্টেডিয়ামে তখন এক অদ্ভুত নীরবতা। স্পট কিক নিতে এগিয়ে আসেন মেসি। কোনও ভুল করেননি আর্জেন্তিনার অধিনায়ক। ডান দিকের উপরের কোণে শক্তিশালী শটে বল পাঠিয়ে আর্জেন্তিনাকে ৩-০ এগিয়ে দেন তিনি।
জাতীয় দলের জার্সিতে এটি ছিল মেসির ১২৬তম গোল। গোল করার পর সতীর্থদের সঙ্গে তাঁর উদযাপনও হয়ে ওঠে বিদায়ী ম্যাচের অন্যতম স্মরণীয় মুহূর্ত।
ম্যাচ শেষ হওয়ার আগে আরও একবার গোল করার সুযোগ পেয়েছিলেন মেসি। তাঁর নিখুঁত প্লেসিং শট বারে লেগে ফিরে আসে। এরপর অন্তিম মুহূর্তে বক্সের বাইরে প্রায় ২১ মিটার দূরত্ব থেকে ফ্রি-কিক পায় আর্জেন্তিনা।
গ্যালারিতে তখন হাজার হাজার মোবাইলের ফ্ল্যাশ জ্বলছে। প্রত্যেকের অপেক্ষা ছিল মেসির শেষ আন্তর্জাতিক জাদুর জন্য। কিন্তু তাঁর ফ্রি-কিক বারের ওপর দিয়ে চলে যায়।
তারপর বাজে শেষ বাঁশি। ৩-০ ব্যবধানে ম্যাচ জিতে আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানান মেসি। গোল করলেন, গোল করালেন, অসংখ্য স্মৃতি রেখে গেলেন। তবে শেষ ম্যাচটিও তাঁকে মনে করিয়ে দিল—ফুটবলের সবচেয়ে বড় কিংবদন্তিরাও শেষ পর্যন্ত রক্তমাংসের মানুষ। আর সেই কারণেই তাঁর বিদায়ের রাতের আবেগ এতটা গভীর।



