পূর্ব বর্ধমানের কাটোয়াতে তৃণমূল কংগ্রেসের বিজয়া সম্মিলনীতে মঞ্চে উঠে এক অনন্য মন্তব্য করলেন দলের রাজ্য সম্পাদক কুণাল ঘোষ। গান গেয়ে বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে মা লক্ষ্মীর সঙ্গে তুলনা করেন। এই মন্তব্য ঘিরে ইতিমধ্যেই রাজনৈতিক মহলে শুরু হয়েছে তুমুল বিতর্ক ও তর্ক-বিতর্ক।
কাটোয়া ১ নম্বর ব্লকের পঞ্চাননতলায় আয়োজিত বিজয়া সম্মিলনীতে সলিল চৌধুরীর কথা ও সুরে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের জনপ্রিয় গান ‘কোনও এক গাঁয়ের বধূর কথা তোমায় শোনাই শোনো’ গেয়ে ওঠেন কুণাল ঘোষ। গানের মধ্যে রয়েছে— “গাঁয়ের বধূর শাঁখের ডাকে, লক্ষ্মী এসে ভরে দিত, গোলা সবার ঘরে ঘরে”। এই লাইন ধরে কুণাল বলেন, “গাঁয়ের বধূর শাঁখের ডাকে যিনি আসেন, তিনি মা লক্ষ্মী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।”


এই মন্তব্যের সঙ্গে সঙ্গেই অনুষ্ঠানের পরিবেশে তৈরি হয় বিশেষ আবহ। উপস্থিত তৃণমূল সমর্থকরা হাততালিতে মুখর হয়ে ওঠেন। কুণাল ঘোষের বক্তব্যের মধ্যে দিয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে— তৃণমূল নেতৃত্ব মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভাবমূর্তিকে কেবল রাজনৈতিক নেতা নয়, সমৃদ্ধি ও উন্নয়নের প্রতীক হিসেবেও তুলে ধরতে চাইছে।

কুণাল এখানেই থামেননি। একই গানের আরেকটি লাইন উল্লেখ করে বিজেপি, সিপিএম ও কংগ্রেসকে আক্রমণ করেন তিনি। বলেন, “ডাকিনী যোগিনী এল শত নাগিনী, এল পিশাচেরা এল রে”—এই গানেই যেমন বলা হয়েছে, আজ বিজেপি, সিপিএম, কংগ্রেস ঠিক সেই রকমই ডাকিনী, যোগিনী আর পিশাচ।”
পরে সাংবাদিক বৈঠকে তাঁকে সরাসরি জিজ্ঞাসা করা হয়— তিনি কি সত্যিই মুখ্যমন্ত্রীকে মা লক্ষ্মীর সঙ্গে তুলনা করেছেন? উত্তরে কুণাল বলেন, “মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে নানা রকমের তুলনা করা যায়। মা দুর্গাও তুলনা করা যায়, মা লক্ষ্মীও তুলনা করা যায়। ডেভেলপমেন্ট, সম্প্রীতি, সমৃদ্ধি, শান্তি— এই সব কিছুরই প্রতীক মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।”


তাঁর এই বক্তব্যের পর স্বভাবতই প্রতিক্রিয়া জানায় বিজেপি। দলের নেতা সজল ঘোষ বলেন, “এই মন্তব্য নিয়ে কোনও ভদ্রলোকের বলার কিছু থাকে না। কুণাল ঘোষরা যে করে খায়, তাতে তো মা লক্ষ্মী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ই। উনি না থাকলে এদের অনেকের বাড়িতে হাঁড়ি চড়ত না।”
বিজেপির এই কটাক্ষে রাজনৈতিক তরজার তাপ বেড়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তৃণমূলের শীর্ষ নেতৃত্বের প্রতি কুণালের এই মন্তব্য আসলে একটি কৌশলগত ইমেজ বিল্ডিং-এর অংশ। সাম্প্রতিক বছরগুলিতে তৃণমূল বারবার ধর্মীয় প্রতীক ও সাংস্কৃতিক রেফারেন্স ব্যবহার করে জনসংযোগের ক্ষেত্র তৈরি করেছে। এর আগে তৃণমূল সাংসদ ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছিলেন, “চৈতন্যদেবের প্রকৃত উত্তরসূরি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।” আবার তৃণমূল বিধায়ক নির্মল মাজি মুখ্যমন্ত্রীকে মা সারদার সঙ্গে তুলনা করেছিলেন।
রাজনৈতিক মহলে তাই প্রশ্ন উঠেছে— ‘মা লক্ষ্মী’, ‘মা সারদা’ ও ‘চৈতন্যদেব’— এই ধারাবাহিক তুলনার মাধ্যমে তৃণমূল কি মুখ্যমন্ত্রীকে একটি বৃহত্তর সাংস্কৃতিক প্রতীকে রূপান্তরিত করতে চাইছে?
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরনের বক্তব্য মূলত গ্রামীণ ও ধর্মপ্রাণ ভোটব্যাঙ্কের সঙ্গে আবেগীয় সংযোগ গড়ে তোলার চেষ্টা। বিশেষ করে পুজোর মরশুমে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক প্রতীকের মাধ্যমে রাজনৈতিক বার্তা দেওয়া জনমনে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।
অন্যদিকে বিজেপি তৃণমূলের এই মন্তব্যকে কটাক্ষ করে “ব্যক্তিপূজার রাজনীতি” বলে আখ্যা দিচ্ছে। তাদের মতে, রাজ্য সরকারের ব্যর্থতা আড়াল করতে এই ধরনের আবেগতাড়িত তুলনার আশ্রয় নেওয়া হচ্ছে।
তবে একথা অস্বীকার করা যাবে না যে, ‘মা লক্ষ্মী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়’ মন্তব্যটি ইতিমধ্যেই সোশ্যাল মিডিয়া ও রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার কেন্দ্রে চলে এসেছে। তৃণমূল সমর্থকেরা একে দলের নেত্রীর প্রতি শ্রদ্ধা হিসেবে দেখছেন, আর বিরোধীরা দেখছে রাজনৈতিক প্রপাগান্ডা হিসেবে।
এই ঘটনাকে ঘিরে যে রাজনৈতিক উত্তাপ তৈরি হয়েছে, তা পুজোর মরশুমে রাজনৈতিক ক্যালেন্ডারে নতুন বিতর্কের অধ্যায় খুলে দিয়েছে বলেই মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।








