নজরবন্দি ব্যুরো: রোগীর শয্যার পাশে চিকিৎসার সরঞ্জাম নয়, রাখা হয়েছে ইঁদুর ধরার কল! মালদহ মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের ওয়ার্ডের এমন ছবিকে ঘিরে তীব্র চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে। রোগী ও তাঁদের পরিজনদের অভিযোগ, রাত বাড়লেই ওয়ার্ডে দাপিয়ে বেড়ায় ইঁদুর, এমনকি সুযোগ পেলে রোগীদের কামড়েও দিচ্ছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষও ইঁদুরের উপদ্রবের কথা স্বীকার করেছে।
মালদহ মেডিক্যাল কলেজ (Malda Medical College)-এর বিভিন্ন ওয়ার্ডে দীর্ঘদিন ধরেই ইঁদুরের উৎপাত বলে অভিযোগ রোগী ও তাঁদের আত্মীয়দের। তাঁদের দাবি, দিনের তুলনায় রাতে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়। ইঁদুর কখনও রোগীর খাবারে মুখ দিচ্ছে, আবার কখনও সরাসরি রোগীর শয্যার উপর উঠে পড়ছে।
পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে, রোগীদের নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখে শয্যার পাশেই ইঁদুর ধরার কল রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। বিষয়টি নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে হাসপাতালের পরিষেবা ও পরিচ্ছন্নতা ব্যবস্থা নিয়ে।
মালদহ মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের সুপার প্রসেনজিৎ বর জানিয়েছেন, ইঁদুরের দৌরাত্ম্যের বিষয়টি কর্তৃপক্ষের নজরে রয়েছে। অসুস্থ রোগীদের যাতে ইঁদুরের কারণে কোনও ক্ষতি না হয়, সেই কারণেই তাঁদের শয্যার পাশে ইঁদুর ধরার কল রাখা হয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দাবি, ইঁদুরের উপদ্রব কমাতে ইতিমধ্যেই ‘পেস্ট কন্ট্রোল’ করা হয়েছে। কিন্তু তাতেও সমস্যা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। হাসপাতালের বিভিন্ন অংশে ফল্স সিলিং থাকায় ইঁদুরের গতিবিধি নিয়ন্ত্রণ করা আরও কঠিন হয়ে পড়ছে বলে জানিয়েছেন সুপার।
শুধু ইঁদুরের উৎপাত নয়, হাসপাতালের পরিকাঠামো নিয়েও অভিযোগ তুলেছেন রোগী ও তাঁদের পরিজনরা। তাঁদের একাংশের দাবি, কয়েকটি ওয়ার্ডের মেঝেতে জল জমে রয়েছে। ফলে চিকিৎসা পরিষেবার পাশাপাশি রোগীদের স্বাভাবিক চলাফেরাতেও সমস্যা হচ্ছে।
এই অভিযোগের ব্যাখ্যায় প্রসেনজিৎ বর জানিয়েছেন, পাইপলাইনে সমস্যার কারণেই কয়েকটি ওয়ার্ডে জল জমেছে। একইসঙ্গে বেতন সংক্রান্ত সমস্যার জেরে সাফাইকর্মীদের একাংশ কাজ করছেন না বলেও জানিয়েছেন তিনি। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের আশ্বাস, দ্রুত এই সমস্যাগুলির সমাধানের চেষ্টা চলছে।
মালদহ মেডিক্যালের সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে সরব হয়েছেন ইংরেজবাজারের প্রাক্তন বিজেপি বিধায়ক শ্রীরূপা মিত্র চৌধুরী (Sreerupa Mitra Chaudhury)। তাঁর বক্তব্য, রোগীর শয্যার পাশে যদি ইঁদুর ধরার যন্ত্র রাখতে হয়, তাহলে হাসপাতালের ভিতরে ইঁদুরের উপস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন থাকার কথা নয়।
শ্রীরূপার অভিযোগ, মালদহ মেডিক্যাল কলেজে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ তৈরি হয়েছে। তাঁর দাবি, সরকার পরিবর্তন হলেও সরকারি ব্যবস্থার দায়িত্বে থাকা আধিকারিকদের কার্যপদ্ধতিতে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন হয়নি। এই কারণেই হাসপাতালের মতো গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন তিনি।
শ্রীরূপা জানিয়েছেন, বিষয়টি তিনি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর (Suvendu Adhikari) নজরেও আনবেন। তাঁর বক্তব্য, সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা মানুষকে সুস্থ পরিবেশ দেওয়ার দায়িত্ব প্রশাসনের। সেখানে রোগীর বেডের পাশে ইঁদুর ধরার কল রাখার মতো পরিস্থিতি তৈরি হওয়া নিঃসন্দেহে উদ্বেগের।
মালদহ মেডিক্যাল কলেজে ইঁদুরের উৎপাত অবশ্য একেবারে নতুন অভিযোগ নয়। এর আগেও এই হাসপাতালের ওয়ার্ডে রোগীর শয্যার উপর ইঁদুর ঘোরাফেরার ছবি ও অভিযোগ প্রকাশ্যে এসেছিল। ফলে এবার ফের একই ধরনের অভিযোগ সামনে আসায় হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতা ও পেস্ট কন্ট্রোল ব্যবস্থা কতটা কার্যকর, তা নিয়েই প্রশ্ন উঠছে।
রোগীর পাশে যেখানে থাকা উচিত চিকিৎসা ও নিরাপত্তার নিশ্চয়তা, সেখানে ইঁদুর ধরার কলের উপস্থিতি সরকারি হাসপাতালের পরিষেবা ব্যবস্থার ছবিটাই সামনে আনছে। এখন নজর, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ইঁদুর, জল জমা এবং সাফাইকর্মীদের সমস্যা কত দ্রুত মেটে।



