নজরবন্দি ব্যুরো: আর্জেন্টিনার জার্সিতে আর মাঠে নামবেন না লিওনেল মেসি (Lionel Messi)। দীর্ঘ ২১ বছরের আন্তর্জাতিক ফুটবল অধ্যায়ের ইতি টেনে সোমবার জাতীয় দল থেকে অবসরের ঘোষণা করলেন আর্জেন্টাইন মহাতারকা। ২০২৬ বিশ্বকাপ ফাইনালে স্পেনের কাছে হারের পরই সিদ্ধান্তটি নিয়েছিলেন তিনি; বাবার মৃত্যুর পর সেই সিদ্ধান্তে আর কোনও বদল আনেননি।
মেসির অবসরের সিদ্ধান্ত অবশ্য আচমকা নয়। ২০২৬ বিশ্বকাপের ফাইনাল শেষ হওয়ার দু’দিন পরই তিনি অবসরের বার্তা লিখে ফেলেছিলেন। সেই সময় সেটি প্রকাশ্যে আনেননি। সোমবার সোশ্যাল মিডিয়ায় সেই সিদ্ধান্তের কথা জানিয়ে স্পষ্ট করে দিয়েছেন—আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের সঙ্গে তাঁর পথচলা এবার সত্যিই শেষ।
২০২৬ বিশ্বকাপের ফাইনালে স্পেনের কাছে হেরে ট্রফি হাতছাড়া হয়েছিল আর্জেন্টিনার। নিউ জার্সির ইস্ট রাদারফোর্ডে অনুষ্ঠিত সেই ম্যাচেই জাতীয় দলের জার্সিতে মেসির শেষ ম্যাচ হয়ে গেল। ২০২২ সালে বিশ্বকাপ জেতার পর এবার ফাইনালে রানার্স আপ হয়েই আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানালেন তিনি।
তবে অবসরের সিদ্ধান্তের পিছনে শুধু মাঠের ফল নয়, রয়েছে গভীর ব্যক্তিগত আবেগও। মেসির বাবা এবং দীর্ঘদিনের এজেন্ট হোর্হে মেসি (Jorge Messi) ৮ আগস্ট ২০২৬ রোসারিওতে ৬৮ বছর বয়সে মারা যান। দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকার পর তাঁর মৃত্যু মেসির জীবনে বড় ধাক্কা হয়ে আসে।
বাবার মৃত্যুর কয়েক দিন পর মেসি জানিয়েছিলেন, তাঁর ফুটবল ভবিষ্যৎ নিয়েই সংশয় তৈরি হয়েছে। বাবাকে নিয়ে আবেগঘন বার্তায় তিনি বলেছিলেন, তাঁকে ছাড়া কীভাবে এগোবেন তা বুঝতে পারছেন না এবং আর কতদিন ফুটবল চালিয়ে যাবেন, তা নিয়েও তাঁর গুরুতর সংশয় রয়েছে।
আর্জেন্টিনার হয়ে মেসির আন্তর্জাতিক পথচলা শুরু হয়েছিল ২০০৫ সালে। দুই দশকেরও বেশি সময়ের সেই যাত্রায় তিনি জাতীয় দলের হয়ে ২০০-র বেশি ম্যাচ খেলেছেন এবং দেশের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা হিসেবে রেকর্ড গড়েছেন। ২০২২ সালের বিশ্বকাপ জয় সেই ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় সাফল্যগুলির একটি হয়ে থাকবে।
শুধু বিশ্বকাপ নয়, মেসির নেতৃত্বে আর্জেন্টিনা ২০২১ ও ২০২৪ সালের কোপা আমেরিকাও জিতেছে। একসময় জাতীয় দলের হয়ে কোনও বড় ট্রফি জিততে না পারার জন্য যে মেসিকে প্রবল সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছিল, পরবর্তী বছরগুলিতে সেই তিনিই আর্জেন্টিনার ফুটবলের সবচেয়ে সফল অধ্যায়ের মুখ হয়ে ওঠেন।
মেসির আন্তর্জাতিক অবসর অবশ্য তাঁর জীবনে দ্বিতীয়বারের ঘটনা। ২০১৬ সালে কোপা আমেরিকা সেন্টেনারিওর ফাইনালে চিলির কাছে হারের পরও তিনি জাতীয় দল থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা করেছিলেন। কিন্তু সেই সিদ্ধান্ত থেকে পরে সরে এসে আবার আর্জেন্টিনার জার্সিতে ফিরেছিলেন। এরপরই শুরু হয় তাঁর ক্যারিয়ারের সবচেয়ে সফল আন্তর্জাতিক পর্ব।
সেই প্রত্যাবর্তনের পরের গল্পটাই আজ মেসিকে কিংবদন্তির আসনে বসিয়েছে। কোপা আমেরিকা জয়, ফিনালিসিমা এবং শেষ পর্যন্ত ২০২২ বিশ্বকাপ—একটির পর একটি সাফল্যে পূর্ণ হয়েছে তাঁর জাতীয় দলের অধ্যায়। ২০২৬ বিশ্বকাপের ফাইনাল পর্যন্ত পৌঁছে শেষবারের মতো লড়াই করাও সেই দীর্ঘ যাত্রারই অংশ।
এবার অবশ্য প্রত্যাবর্তনের কোনও ইঙ্গিত দেননি মেসি। বরং তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট, নতুন প্রজন্মের ফুটবলারদের জন্য জায়গা করে দেওয়ার সময় এসেছে। আর্জেন্টিনার হয়ে ২০ বছরেরও বেশি সময়ের স্মৃতি সঙ্গে নিয়ে এবার তিনি জাতীয় দলের সমর্থক হিসেবেই বাইরে থেকে দলকে দেখবেন।
মেসির বিদায় তাই শুধুমাত্র একজন ফুটবলারের অবসর নয়, আর্জেন্টিনা ফুটবলের একটি যুগের সমাপ্তি। যে জার্সিতে ব্যর্থতার তীব্র যন্ত্রণা থেকে বিশ্বকাপ জয়ের সর্বোচ্চ আনন্দ—সবই পেয়েছেন তিনি, সেই জার্সি এবার অন্য কারও হাতে উঠবে। মেসি থাকবেন ইতিহাসে, আর আর্জেন্টিনার ফুটবল শুরু করবে তাঁর পরবর্তী অধ্যায়।



