গল্প এবং ইতিহাস—এই দুই বিষয়ই বরাবর জিৎকে আকর্ষণ করে। অনন্ত সিংহকে ঘিরে তৈরি ‘কেউ বলে বিপ্লবী কেউ বলে ডাকাত’-এর গল্প প্রথম শোনার পরই ছবিটি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তিনি। প্রায় দু’বছর পর এই ছবির মাধ্যমে বড় পর্দায় ফিরছেন অভিনেতা। সবচেয়ে বড় চমক, ছবিতে একসঙ্গে নয়টি চরিত্রে দেখা যাবে তাঁকে। প্রতিটি চরিত্রের আলাদা লুক তৈরি করতে কখনও এক ঘণ্টা, কখনও আড়াই ঘণ্টা পর্যন্ত সময় লেগেছে। ছবি, চরিত্র, ‘সুপারস্টার’ ইমেজ এবং বাংলা ইন্ডাস্ট্রি নিয়ে নিজের ভাবনার কথা জানালেন জিৎ।
অনন্ত সিংহের গল্প কেন এতটা টানল?
আমার কাছে সব সময় দুটো বিষয় খুব গুরুত্বপূর্ণ—গল্প এবং ইতিহাস। একজন শিল্পী হিসেবে চেষ্টা করি দর্শকদের সামনে এমন গল্প তুলে ধরতে, যেখানে নতুন কিছু আবিষ্কার করার সুযোগ থাকে। ‘কেউ বলে বিপ্লবী কেউ বলে ডাকাত’-এর গল্পটা প্রথম যখন শুনেছিলাম, তখনই খুব আকর্ষণীয় লেগেছিল।
অনন্ত সিংহের নাম আগে শুনেছিলাম। কিন্তু তাঁর জীবনের এতটা বিস্তারিত গল্প আগে কখনও শুনিনি। পুরো বিষয়টা জানার পর মনে হয়েছিল, এর মধ্যে অনেক আকর্ষণীয় দিক রয়েছে। তখনই ঠিক করি, এই ছবিটা করব।
এক ছবিতে নয়টি চরিত্র। প্রত্যেকটির লুক তৈরি করতে কতটা সময় লেগেছে?
অনেকটাই সময় লেগেছে। মেকআপের দায়িত্বে ছিলেন সোমনাথ কুণ্ডু এবং কস্টিউমের দায়িত্বে সঞ্চিতা ঘটক আচার্য। দু’জন মিলে প্রত্যেকটা চরিত্রের লুক তৈরি করেছেন। কোনও চরিত্রের ক্ষেত্রে এক-দু’ঘণ্টা লেগেছে, আবার কোনও লুক তৈরি করতে আড়াই ঘণ্টাও সময় লেগেছে।
আসলে চরিত্র অনুযায়ী সময়টা বদলেছে। আমার নিজেরও প্রস্তুতি ছিল। স্ক্রিপ্ট পাওয়ার পর বাড়িতে বা অফিসে বসে চরিত্রগুলোর স্কেচ করতাম। পুরো স্ক্রিপ্ট তৈরি করতেও প্রায় সাড়ে তিন মাস সময় লেগেছে। আমার চেষ্টা ছিল প্রতিটি চরিত্রকে আলাদা করে ফুটিয়ে তোলা। দর্শক যেন বুঝতে পারেন, তাঁরা একই অভিনেতাকে নয়, সম্পূর্ণ আলাদা মানুষকে দেখছেন।
দর্শকের প্রতিক্রিয়ায় কী ধরনের পরিবর্তন দেখতে পাচ্ছেন?
আমি একটা আলাদা ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখতে পাচ্ছি। ‘খাকি: দ্য বেঙ্গল চ্যাপ্টার’-এর ক্ষেত্রেও মানুষের মধ্যে একটা আলাদা প্রভাব তৈরি হয়েছিল। কোনও কাজ দর্শককে অন্যভাবে ছুঁয়ে গেলে সেটা একজন শিল্পী হিসেবে খুব ভালো লাগে।
শুধু একই ধরনের প্রশংসা বারবার শুনলে আমার মনে হয়, নতুন কিছু হয়তো করা হল না। নতুন কিছু করার পর দর্শকের মধ্যে অন্যরকম প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারাটাই আমার কাছে আসল সাফল্য।
এতগুলো ছবি করেছেন। কোনও কাজ নিয়ে আফসোস রয়েছে?
হ্যাঁ, কয়েকটা কাজ নিয়ে আফসোস হয়েছে। এটা স্বাভাবিক। একটা সময় পরে নিজের কাজের দিকে ফিরে তাকালে মনে হয়, কোনও একটা বিষয় হয়তো অন্যভাবে করা যেত। শিল্পী হিসেবে এই আত্মসমালোচনাটা থাকাও জরুরি।
এমন কোনও চরিত্র রয়েছে, যা এখনও করা হয়নি?
অনেক চরিত্রই এখনও করা হয়নি। আমার প্রায় ৬০তম ছবি হতে চলেছে। এটা অবশ্যই উদ্যাপন করার মতো একটা মাইলস্টোন। কিন্তু এত বছর কাজ করার পরেও আমার মনে হয়, এখনও অনেক কিছু করার বাকি রয়েছে।
‘সুপারস্টার’ ইমেজ কি কখনও চরিত্র বাছাইয়ের ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়ায়?
আমি সেটা নিয়ে খুব বেশি ভাবার সময় পাই না। আমার কাছে চরিত্রটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ‘খাকি: দ্য বেঙ্গল চ্যাপ্টার’ এবং এই ছবির মতো কাজ করতে গিয়ে নিজের পরিচিত ইমেজের বাইরে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছি।
একজন অভিনেতা হিসেবে নতুন কিছু করা আমার কাছে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। দর্শক আমাকে যে ধরনের চরিত্রে আগে দেখেছেন, তার বাইরে গিয়ে কাজ করার সুযোগ পেলে আমি সেটা নিতে চাই।
এত দীর্ঘ কেরিয়ারে কখনও কি মনে হয়েছে, অভিনেতা জিৎকে আরও অন্যভাবে ব্যবহার করা যেত?
আমি অনেক সাক্ষাৎকারেই বলেছি, কিছু জায়গায় আমরা কিছু জিনিস হারিয়ে ফেলেছি। হয়তো সঠিক জায়গায় সঠিক মানুষকে তুলে ধরতে পারিনি। তবে এর দায় শুধু একজন অভিনেতার নয়।
এটা নির্মাতা, লেখক এবং গোটা ইন্ডাস্ট্রির বিষয়। একটা সম্পূর্ণ ইকোসিস্টেমের সঙ্গে ব্যাপারটা জড়িত। ইন্ডাস্ট্রির উন্নতির সঙ্গে রাজ্যের সামগ্রিক উন্নয়নও জড়িয়ে রয়েছে। কর্মসংস্থান, উন্নয়ন, নিরাপত্তা, মানুষের আয়—সব কিছুরই একটা প্রভাব বিনোদন জগতের উপর পড়ে।
রাজ্য যদি ভালো জায়গায় থাকে, তার প্রতিফলন আমাদের সিনেমাতেও দেখা যাবে। তাই শুধু সিনেমা নিয়ে আলাদা করে ভাবলে হবে না, গোটা পরিবেশটার উন্নয়ন প্রয়োজন।
১৫ অগস্টে মুক্তি নিয়ে কতটা আশাবাদী?
প্রথম থেকেই প্রযোজনা সংস্থার সঙ্গে যখন মুক্তির তারিখ নিয়ে আলোচনা হয়েছিল, তখন প্রায় একই সময়ে ১৫ অগস্টের কথা ঠিক হয়েছিল। আমার মনে হয় স্বাধীনতা দিবসের সময়টা এই ছবির জন্য ভালো হতে পারে।
ওই সময়টার একটা আলাদা এনার্জি রয়েছে, একটা আলাদা ভাইব রয়েছে। ছবির বিষয়বস্তুর সঙ্গেও সেই আবহটা দর্শকের মধ্যে ইতিবাচক অনুভূতি তৈরি করতে পারে বলে আমার মনে হয়।
পুজোয় নতুন ছবি মুক্তির সম্ভাবনা রয়েছে?
অবশ্যই ভাবা যায়। এটা একটা ওপেন মার্কেট এবং ওপেন ইন্ডাস্ট্রি। যে কোনও ছবি যে কোনও সময়ে মুক্তি পেতে পারে।
তবে কখনও কখনও ইন্ডাস্ট্রির ব্যালান্সের জন্য একে অন্যের সঙ্গে আলোচনা করা যেতে পারে। কিন্তু এমন কোনও নিয়ম নেই যে নির্দিষ্ট সময়েই ছবি মুক্তি পেতে হবে। যদি মনে হয় পুজোর সময়টা কোনও ছবির জন্য ভালো উইন্ডো হবে, তা হলে অবশ্যই সেটা নিয়ে ভাবা যায়।
পুজো মানেই কলকাতা। এখনও কি কলকাতায় থেকে পুজো কাটানোর চেষ্টা করেন?
কখনও থাকি, কখনও থাকি না। এ বারও হয়তো কয়েক দিন থাকব। তারপর কী হবে, সেটা এখনই জানি না। তবে ছোটবেলার পুজোর অনেক স্মৃতি রয়েছে।
ছোটবেলার পুজো আর এখনকার পুজোর মধ্যে সবচেয়ে বড় পার্থক্য কী?
ছোটবেলায় পুজোর আগে নতুন জামাকাপড় কেনা, আত্মীয়দের জামাকাপড় দেওয়া, বাবা-মায়ের সঙ্গে ঠাকুর দেখতে যাওয়া—এই বিষয়গুলোই ছিল পুজোর আনন্দের বড় অংশ।
এখন জীবনটা অনেকটাই বদলে গিয়েছে। আমার পরিবারের বাচ্চারা এখনও ঠাকুর দেখতে যায়। আমি সব সময় তাদের সঙ্গে যেতে পারি না। তবে অন্যদের আনন্দ করতে দেখতেও আমার ভালো লাগে।
সুপারস্টার হওয়ার পর এমন কী রয়েছে, যা আর আগের মতো করতে পারেন না?
খুব বেশি কিছু নিয়ে আমার আফসোস নেই। রাস্তায় দাঁড়িয়ে খেতে না পারলে বাড়িতে খাব, অফিসে খাব কিংবা যেখানে থাকব, সেখানেই খাব। এটা নিয়ে আমার কোনও সমস্যা নেই।
আসলে আমি এই স্বপ্নের পিছনে ছুটেছি। ঈশ্বর আমাকে সেই স্বপ্ন দেখার সুযোগ দিয়েছেন। তাই যতদিন পারি, এই জীবনটাকে উপভোগ করতে চাই। আমি খুশি।
প্রায় দু’বছর পর এই ছবির মাধ্যমে দর্শকের সামনে ফিরছেন। ছবিটা আপনার কাছে কতটা গুরুত্বপূর্ণ?
এই চরিত্রটা আমার জীবনের অন্যতম চ্যালেঞ্জিং চরিত্র। প্রায় দু’বছর পর দর্শকের সামনে আসছি। এই সময়টায় দর্শকের মধ্যে একটা অপেক্ষা তৈরি হয়েছে।
আমি চাই, এই নয়টি চরিত্রের মাধ্যমে সেই অপেক্ষা এবং শূন্যতা পূরণ করতে। অনেকে হয়তো ভাবেন, আমি দু’-তিনটে ছবি করেছি। কিন্তু এই ছবিতে আমাকে একেবারে অন্যভাবে দেখতে পাবেন।
আমি বিশ্বাস করি, দর্শকের ছবিটা ভালো লাগবে। সবাইকে বলব, ছবিটা দেখুন। আমাকে একাধিক রূপে দেখতে পাবেন।



