ইতালির স্কুলগুলিতে বোরখা ও নিকাব নিষিদ্ধ করার প্রস্তাব আনতে চলেছে জর্জিয়া মেলোনি (Giorgia Meloni) সরকার। একইসঙ্গে প্রতিটি শ্রেণিতে বিদেশি পড়ুয়ার সংখ্যার আইনি সীমা নির্ধারণ এবং স্কুলে একীভূত হতে সমস্যায় থাকা বিদেশি পড়ুয়াদের অভিভাবকদের ইতালীয় ভাষা শেখানো বাধ্যতামূলক করার পরিকল্পনাও ঘোষণা করেছেন প্রধানমন্ত্রী। রবিবার নিজের দলের যুব সংগঠনের অনুষ্ঠানে মেলোনি জানান, প্রস্তাবটি শীঘ্রই মন্ত্রিসভায় পেশ করা হবে।
রোমে ব্রাদার্স অব ইতালি (Brothers of Italy)-র যুব সংগঠন জিওভেন্তু নাজিওনালের ‘ফেনিক্স’ অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন মেলোনি। সেখানেই তিনি জানান, ইতালির স্কুলে প্রতি ক্লাসে কতজন বিদেশি পড়ুয়া থাকতে পারবেন, তা আইনের মাধ্যমে নির্দিষ্ট করা হবে। তবে সেই সীমা কত হবে, তা এখনও জানানো হয়নি।
বিদেশি পড়ুয়াদের স্কুলে মানিয়ে নেওয়ার বিষয়টিকেও প্রস্তাবিত ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ করা হচ্ছে। যেসব বিদেশি পড়ুয়া শিক্ষা ব্যবস্থায় একীভূত হতে গুরুতর সমস্যার মুখে পড়বে, তাদের বাবা-মায়ের ইতালীয় ভাষা শেখা বাধ্যতামূলক করার কথা জানিয়েছেন মেলোনি। তাঁর সরকারের যুক্তি, ভাষাগত দক্ষতা বাড়লে পড়ুয়াদের স্কুলের পরিবেশে মানিয়ে নেওয়া সহজ হবে।
বোরখা ও নিকাব নিয়ে মেলোনির ঘোষণাটিও নতুন করে বিতর্ক তৈরি করেছে। প্রস্তাবিত নিয়মে স্কুলে মুখ ঢেকে রাখে এমন পোশাক, বিশেষ করে বোরখা ও নিকাব নিষিদ্ধ করার কথা বলা হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, এটি এখনও ঘোষিত নীতি বা প্রস্তাবের পর্যায়ে রয়েছে; মন্ত্রিসভার অনুমোদন এবং পরবর্তী সংসদীয় প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত এটি কার্যকর আইন নয়।
ইতালিতে বিদেশি পড়ুয়াদের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণের আলোচনা অবশ্য একেবারে নতুন নয়। ২০১০ সালের একটি শিক্ষা মন্ত্রকের নির্দেশিকায় ক্লাসে অ-ইতালীয় পড়ুয়াদের জন্য ৩০ শতাংশের একটি সীমা নির্ধারণ করা হয়েছিল। তবে বিভিন্ন এলাকায় জনসংখ্যার কাঠামো ও বাস্তব পরিস্থিতির কারণে সেই নিয়ম সব জায়গায় একইভাবে কার্যকর হয়নি বলে ইউরোনিউজ জানিয়েছে। মেলোনির নতুন প্রস্তাব সেই সীমাকে আইনি কাঠামোয় আনার দিকে এগোচ্ছে।
বোরখা বা নিকাব নিয়ে ইতালিতেও গত কয়েক মাসে রাজনৈতিক আলোচনা জোরদার হয়েছে। জুলাইয়ের শেষ দিকে ফুতুরো নাজিওনালে (Futuro Nazionale) নামে একটি রাজনৈতিক দল সংসদের সংস্কৃতি কমিটিতে স্কুলে মুখ ঢাকা পোশাকের বিরুদ্ধে প্রস্তাব এনেছিল। অগস্টে শিক্ষামন্ত্রী জুসেপ্পে ভালদিতারা নিরাপত্তা বিলের সংশোধনীর মাধ্যমে পূর্ণ মুখঢাকা পোশাক নিয়ে পদক্ষেপের সম্ভাবনার কথাও জানিয়েছিলেন।
এর আগে প্রকাশ্য স্থানে মুখ ঢাকার পোশাক নিয়ে ইতালিতে আইনগত বিতর্কও হয়েছে। মার্চে লিগ (League) দলের পক্ষ থেকে ১৯৭৫ সালের রিয়ালে আইনের ৫ নম্বর ধারা সংশোধনের জন্য একটি বিল সিনেটে পেশ করা হয়েছিল। সেখানে জোর করে কাউকে মুখ ঢাকতে বাধ্য করার বিষয়টিকেও অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করার প্রস্তাব ছিল।
ইউরোপের আরও কয়েকটি দেশেও মুখ ঢাকার পোশাক নিয়ে বিধিনিষেধ রয়েছে। ফ্রান্স ২০১১ সালে প্রকাশ্য স্থানে মুখ সম্পূর্ণ ঢেকে রাখার উপর নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করে এবং বেলজিয়ামও একই ধরনের বিধিনিষেধ চালু করেছে। অস্ট্রিয়ায় ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ১৪ বছর বয়স পর্যন্ত মেয়েদের স্কুলে ইসলামি রীতির এমন কিছু মাথা ঢাকা পোশাক পরার উপর নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হয়েছে বলে ইউরোনিউজ জানিয়েছে।
তবে মেলোনি সরকারের প্রস্তাব নিয়ে ইতালিতেই ভিন্নমত সামনে এসেছে। সাংবিধানিক আইন বিশেষজ্ঞ সালভাতোরে কুরেরি মনে করেন, ইতালির সংবিধানের ৩৪ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী স্কুল সকলের জন্য উন্মুক্ত। তাঁর মতে, বিদেশি পড়ুয়াদের স্কুলে একীভূত হওয়ার সুযোগ সীমিত করে এমন কোনও ব্যবস্থা অতিরিক্ত কঠোর হলে সাংবিধানিক অধিকারের প্রশ্ন উঠতে পারে।
এই প্রস্তাবের সময়টিও রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। আগামী বছর ইতালিতে সাধারণ নির্বাচন হওয়ার কথা থাকায় অভিবাসন ও একীভূতকরণ ইতিমধ্যেই রাজনৈতিক আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে। মেলোনির ঘোষিত পদক্ষেপগুলি এখন মন্ত্রিসভা ও সংসদীয় প্রক্রিয়ার দিকে এগোয় কি না, এবং শেষ পর্যন্ত কোন কোন বিধান আইনে পরিণত হয়, সেদিকেই নজর থাকবে।



