ভারতের শেয়ার বাজারে সপ্তাহের শুরুটা হল নেতিবাচক সুরে। সোমবার (১৩ জুলাই, ২০২৬) আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দামের তীব্র উল্লম্ফন, টাকার দরপতন এবং বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার জেরে বাজার খুলতেই চাপে পড়ে Sensex ও Nifty 50। একই সঙ্গে শুরু হওয়া কর্পোরেট ফল প্রকাশের মরসুম, বিদেশি প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের (FII) অবস্থান এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির দিকেও নজর রেখেছেন বিনিয়োগকারীরা।
দিনের শুরুতেই Nifty 50 প্রায় ০.৭৭ শতাংশ নেমে ২৪,০২১.৩০ স্তরে লেনদেন শুরু করে। অন্যদিকে BSE Sensex ০.৮৩ শতাংশ পতন নিয়ে ৭৬,৯২৮.৩৫ পয়েন্টে পৌঁছে যায়। শুক্রবারের ইতিবাচক সমাপ্তির পর নতুন সপ্তাহে বাজারে এই দুর্বল সূচনা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে সতর্কতার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
এদিন মুদ্রাবাজারেও চাপ স্পষ্ট ছিল। USD/INR বেড়ে ৯৫.৮৬০-এ পৌঁছেছে, অর্থাৎ মার্কিন ডলারের তুলনায় ভারতীয় রুপির মূল্য আরও দুর্বল হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, দুর্বল রুপির ফলে অপরিশোধিত তেল-সহ বিভিন্ন আমদানি পণ্যের খরচ বাড়তে পারে, যা ভবিষ্যতে মূল্যস্ফীতির উপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
পণ্য বাজারের পরিস্থিতিও শেয়ার বাজারের জন্য খুব একটা স্বস্তিদায়ক নয়। আন্তর্জাতিক বাজারে WTI Crude Oil-এর দাম প্রায় ৪.০৫ শতাংশ বেড়ে ব্যারেল প্রতি ৭৪.২৯ ডলারে পৌঁছেছে। একই হারে বেড়ে Brent Crude-এর দাম দাঁড়িয়েছে ৭৯.০৮ ডলারে। ভারতের মতো তেল আমদানিনির্ভর অর্থনীতির ক্ষেত্রে এই মূল্যবৃদ্ধি জ্বালানি আমদানির খরচ বাড়ানোর পাশাপাশি বিভিন্ন শিল্প সংস্থার উৎপাদন ব্যয়ও বাড়াতে পারে।
অন্যদিকে নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে পরিচিত সোনার দাম ১.১১ শতাংশ কমে ৪,০৬৭.৮০-এ নেমে এসেছে। বাজার বিশেষজ্ঞদের মতে, সোনার দাম কমলেও বিনিয়োগকারীদের সতর্ক মনোভাব এখনও পুরোপুরি কাটেনি।
কোন শেয়ারগুলিতে নজর?
সামগ্রিক বাজার দুর্বল থাকলেও কয়েকটি শেয়ারে কেনার আগ্রহ দেখা গেছে।
- HDFC Bank তুলনামূলক শক্ত অবস্থান ধরে রেখেছে।
- Hindalco Industries-এর শেয়ারেও নির্বাচিত কেনাকাটা হয়েছে।
- আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বৃদ্ধির জেরে ONGC-র শেয়ারেও ইতিবাচক প্রবণতা দেখা গেছে।
অন্যদিকে লাভ তুলে নেওয়ার প্রবণতায় চাপের মুখে পড়েছে কয়েকটি বড় সংস্থা।
- Maruti Suzuki India-র শেয়ার দুর্বল থেকেছে।
- Hindustan Unilever-এ বিক্রির চাপ লক্ষ্য করা গেছে।
- Bajaj Finance-এর শেয়ারেও পতনের ছবি দেখা যায়।
বাজারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ কী?
বিশেষজ্ঞদের মতে, অপরিশোধিত তেলের দাম যদি দীর্ঘ সময় উঁচু স্তরে থাকে, তাহলে ভারতের আমদানি ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে। তার সঙ্গে দুর্বল রুপি যুক্ত হলে শিল্প সংস্থাগুলির কাঁচামালের খরচ এবং মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। ফলে বাজারের মনোভাবেও তার প্রভাব পড়তে পারে।
এদিকে এশিয়ার বাজারগুলিও বিশ্ব অর্থনীতির গতি, পণ্যের দাম এবং বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভবিষ্যৎ সুদের হার সংক্রান্ত সিদ্ধান্তের দিকে নজর রাখছে। একই সঙ্গে ভারতের কর্পোরেট ফলাফল প্রকাশের মরসুমও আগামী কয়েক সপ্তাহে বাজারের দিক নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে।
আগামী দিনে বিনিয়োগকারীদের নজরে থাকবে অপরিশোধিত তেলের দামের ওঠানামা, রুপির বিনিময় হার, কোম্পানিগুলির ত্রৈমাসিক ফলাফল, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের ক্রয়-বিক্রয়, বৈশ্বিক বাজারের গতিপ্রকৃতি এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক তথ্য। কর্পোরেট আয় প্রত্যাশা অনুযায়ী ইতিবাচক হলে এবং আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি স্থিতিশীল থাকলে বাজারে ফের গতি আসতে পারে। তবে আপাতত তেলের দাম, রুপির অবস্থান এবং বৈশ্বিক অনিশ্চয়তাই ভারতীয় শেয়ার বাজারের প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে থাকবে।



