ভারতের শেয়ার বাজারে টানা তিন দিন ধরে চলছে বড়সড় পতন। বুধবারও সেনসেক্স (Sensex) ও নিফটি (Nifty 50)-তে তীব্র বিক্রির চাপ দেখা যায়। মাত্র এক দিনের লেনদেনেই বিএসই (BSE)-তে তালিকাভুক্ত সংস্থাগুলির সম্মিলিত বাজার মূলধন প্রায় ৪.২৫ লক্ষ কোটি টাকা কমে যায়। পতনের ধাক্কা অব্যাহত থাকবে বৃহস্পতিবারের ট্রেডিং সেশনও? সেই আশঙ্কাই বেশি বলে মনে করছেন বাজার বিশ্লেষকরা পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ পরিস্থিতি, অপরিশোধিত তেলের দাম বৃদ্ধি, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প (Donald Trump)-এর নতুন শুল্ক পরিকল্পনা, শক্তিশালী ডলার এবং টাকার দুর্বল হওয়া—এই পাঁচটি কারণ বাজারে আতঙ্ক বাড়িয়ে দিয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
বুধবার লেনদেন শেষে সেনসেক্স ৭১৫ পয়েন্ট হারিয়ে ৭৬,৭৫৫ পয়েন্টে বন্ধ হয়। অন্যদিকে নিফটি ৫০ ১৯১ পয়েন্ট নেমে ২৩,৯৯৬ পয়েন্টে পৌঁছায়। বাজারে টানা বিক্রির জেরে বিএসই-তে তালিকাভুক্ত সংস্থাগুলির মোট বাজার মূলধন কমে প্রায় ৪৮০ লক্ষ কোটি টাকা হয়েছে।
সবচেয়ে বেশি ধাক্কা খেয়েছে ফার্মা খাত। ডোনাল্ড ট্রাম্প আমদানি করা জেনেরিক ওষুধের উপর ধাপে ধাপে উচ্চ শুল্ক আরোপের পরিকল্পনার কথা জানানোর পর ভারতীয় ওষুধ সংস্থাগুলির ভবিষ্যৎ রপ্তানি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব সরাসরি ফার্মা শেয়ারগুলিতে পড়েছে।
সেনসেক্সভুক্ত সংস্থাগুলির মধ্যে সবচেয়ে বেশি পতন হয়েছে ইন্ডিগো (IndiGo)-র শেয়ারে, যা ৩ শতাংশেরও বেশি নেমেছে। স্টেট ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া (State Bank of India)-এর শেয়ারও প্রায় ২ শতাংশ কমেছে। এছাড়া ইনফোসিস (Infosys), অ্যাক্সিস ব্যাঙ্ক (Axis Bank), আইসিআইসিআই ব্যাঙ্ক (ICICI Bank), রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজ় (Reliance Industries), এইচডিএফসি ব্যাঙ্ক (HDFC Bank), কোটাক মাহিন্দ্রা ব্যাঙ্ক (Kotak Mahindra Bank), সান ফার্মা (Sun Pharma) এবং টেক মাহিন্দ্রা (Tech Mahindra)-সহ একাধিক বড় সংস্থার শেয়ারেও ১ শতাংশের বেশি পতন দেখা যায়। অন্যদিকে টাইটান (Titan), মারুতি সুজ়ুকি (Maruti Suzuki) এবং ইটার্নাল (Eternal)-এর শেয়ারে সীমিত ঊর্ধ্বগতি লক্ষ্য করা গেছে।
শুধু বড় সংস্থাই নয়, মিডক্যাপ ও স্মলক্যাপ সূচকেও চাপ স্পষ্ট। নিফটি স্মলক্যাপ ১০০ এবং নিফটি মিডক্যাপ ১০০—দুই সূচকই ১ শতাংশের বেশি নেমে যাওয়ায় বাজারজুড়ে নেতিবাচক মনোভাব আরও জোরদার হয়েছে।
কেন ভাঙল শেয়ার বাজার? এই ৫ কারণই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ
১. পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধ পরিস্থিতির অবনতি
ইরানকে ঘিরে পশ্চিম এশিয়ার উত্তেজনা এবং লোহিত সাগরে (Red Sea) জাহাজ চলাচল নিয়ে অনিশ্চয়তা বিশ্ববাজারে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহণ রুটে ঝুঁকি তৈরি হওয়ায় বিনিয়োগকারীরা সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন।
২. অপরিশোধিত তেলের দাম ৯২ ডলারের উপরে
যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাবে জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কায় ব্রেন্ট ক্রুড (Brent Crude)-এর দাম ব্যারেলপিছু ৯২ ডলার ছাড়িয়েছে। ডব্লিউটিআই (WTI Crude)-ও ৮৫ ডলারের ওপরে উঠেছে। বিশ্লেষকদের মতে, তেলের দাম বাড়লে ভারতের আমদানি ব্যয় ও মূল্যস্ফীতির চাপও বাড়ে, যা শেয়ার বাজারের জন্য নেতিবাচক।
৩. ট্রাম্পের নতুন শুল্ক পরিকল্পনা
ডোনাল্ড ট্রাম্প জেনেরিক ওষুধ আমদানির ক্ষেত্রে ধাপে ধাপে শুল্ক বৃদ্ধির প্রস্তাব দিয়েছেন। প্রাথমিকভাবে কিছু সময় শূন্য শুল্ক বহাল থাকলেও পরে ১০০ শতাংশ এবং তার পর ২০০ শতাংশ শুল্কের পরিকল্পনা রয়েছে। এতে ভারতীয় ফার্মা রপ্তানিকারকদের আয় নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
৪. টাকার দর আরও দুর্বল
বুধবার মার্কিন ডলারের বিপরীতে ভারতীয় টাকার মূল্য নেমে ৯৬.৩৬-এ পৌঁছায়। দুর্বল মুদ্রা বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমাতে পারে এবং বিদেশি মূলধন বেরিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়ায়।
৫. শক্তিশালী ডলার ও মার্কিন বন্ড ইয়িল্ড
ডলার ইনডেক্স (Dollar Index) ১০১-এর উপরে অবস্থান করছে। পাশাপাশি মার্কিন ১০ বছরের সরকারি বন্ডের ফলনও বেড়েছে। এর ফলে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা উদীয়মান বাজারের বদলে তুলনামূলক নিরাপদ মার্কিন সম্পদের দিকে ঝুঁকছেন, যার প্রভাব ভারতের শেয়ার বাজারেও পড়ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আগামী কয়েকদিন পশ্চিম এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি, অপরিশোধিত তেলের দামের গতিপ্রকৃতি এবং আন্তর্জাতিক বাজারের সংকেতের উপরই ভারতের শেয়ার বাজারের পরবর্তী দিক নির্ভর করবে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত বাজারে অস্থিরতা অব্যাহত থাকতে পারে।



