পঞ্চম প্রজন্মের মার্কিন বা রুশ যুদ্ধবিমান নয়—ভারতের আকাশরক্ষার ভবিষ্যৎ এবার ফরাসি রাফালেই। ‘অপারেশন সিঁদুর’-এর পর ভারতীয় বিমানবাহিনীর আস্থা আরও পোক্ত, আর সেই বিশ্বাসের উপর ভর করেই ১১৪টি রাফাল যুদ্ধবিমান কেনার পথে প্রায় চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে চলেছে নয়াদিল্লি।
শুল্ক সংঘাত, নিষেধাজ্ঞা ও ভূরাজনৈতিক টানাপোড়েনের আবহে ওয়াশিংটন কিংবা মস্কোর থেকে দূরে সরে এসে প্যারিসের দিকেই ঝুঁকছে ভারত। প্রশ্ন উঠছে—এই সিদ্ধান্ত কি কূটনৈতিক বাধ্যবাধকতার ফল, না কি ‘সিঁদুর’ অভিযানে রাফালের পারফরম্যান্সই বদলে দিল সমীকরণ?
গত বছরের মে মাসে ‘অপারেশন সিঁদুর’ চলাকালীন রাফাল ঘিরে বিতর্কের সূত্রপাত। পাকিস্তান দাবি করে, তারা একটি রাফাল গুলি করে নামিয়েছে। যদিও এই দাবি কখনওই স্বীকার করেনি Indian Air Force। নয়াদিল্লির বক্তব্য ছিল, সব পাইলট নিরাপদে ফিরেছেন। যুদ্ধক্ষেত্রে বিমানের ক্ষতি হতে পারে—এই সাধারণ মন্তব্য ছাড়া সরকারি ভাবে আর কিছু বলা হয়নি। ফলে ধোঁয়াশা থেকেই যায়।
সিঁদুরের পর সংসদেও ওঠে প্রশ্ন। তবে প্রতিরক্ষা মন্ত্রক কোনও প্রামাণ্য তথ্য পেশ করেনি। বরং রাফাল নির্মাতা Dassault Aviation ও ফরাসি প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের দাবি, এই যুদ্ধবিমানটির ডগফাইটে টিকে থাকার রেকর্ড ইউরোপে সেরা। স্পেকট্রা স্যুটের মতো আত্মরক্ষা ব্যবস্থাই তাকে আলাদা করে।
সাবেক সেনাকর্তাদের বক্তব্য, পাকিস্তানের পক্ষে রাফাল ভূপাতিত করা কার্যত অসম্ভব। সংঘাতের সময়ে মনোবল ভাঙতেই ইসলামাবাদ ভুয়ো প্রচার চালায়। সংঘর্ষবিরতির পরেও চারটি রাফাল ধ্বংসের দাবি ছড়ানো হয়। পরে সেই প্রচারে যোগ দেয় চিনও। বিশ্লেষকদের মতে, নিজেদের তৈরি জে-১০সি যুদ্ধবিমানকে রাফালের বিকল্প হিসেবে তুলে ধরতেই বেজিং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে ভুয়ো ছবি-ভিডিয়ো ছড়ায়। যদিও ফরাসি গোয়েন্দারা সেগুলি চিহ্নিত করতেই সেই প্রচার মুখ থুবড়ে পড়ে।


জুন মাসে দাসোর সিইও এরিক ট্র্যাপিয়ে স্বীকার করেন, ভারত একটি রাফাল হারিয়েছে, তবে তা পাকিস্তানের আক্রমণে নয়—কারিগরি ত্রুটিতে। পরবর্তী সময়ে ফরাসি প্রতিরক্ষা মন্ত্রক ও ওয়েব পোর্টালগুলিও জানায়, পাক রেডারে ধরা পড়ার মতো পরিস্থিতিই তৈরি হয়নি।
এই আবহেই গত সেপ্টেম্বরে ১১৪টি রাফাল কেনার প্রস্তাব প্রতিরক্ষা মন্ত্রকে জমা দেয় বিমানবাহিনী। প্রায় একই সময়ে ইন্দোনেশিয়াও রাফাল কেনার পথে হাঁটে। ইতিমধ্যেই তারা ২৪টি জেটের বরাত দিয়েছে এবং সংখ্যা বাড়ানোর পরিকল্পনাও রয়েছে।

বর্তমানে ভারতের হাতে থাকা ৩৬টি রাফাল এফ-৩ মানের। দাসোর সঙ্গে আগের চুক্তি অনুযায়ী, বিনা খরচেই সেগুলিকে এফ-৪ মানে উন্নীত করা হবে। এতে রাফালের ক্ষমতা কয়েক গুণ বাড়বে।
আগামী ফেব্রুয়ারিতে ফরাসি প্রেসিডেন্ট Emmanuel Macron ভারতে আসছেন। প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের ধারণা, তাঁর সফরেই প্রধানমন্ত্রী Narendra Modi-র সঙ্গে ১১৪ রাফালের চুক্তি চূড়ান্ত হতে পারে। মোট চুক্তিমূল্য ৩,৬০০ কোটি ডলারের বেশি হতে পারে বলেই ইঙ্গিত।
সূত্রের খবর, ১১৪টির মধ্যে ১৮টি জেট ফ্রান্সে তৈরি হবে, বাকিগুলি ভারতের মাটিতে। প্রযুক্তি হস্তান্তরের পাশাপাশি অন্তত ৩০ শতাংশ দেশীয় উপাদান ব্যবহারের পরিকল্পনাও রয়েছে। এমনকি দেশীয় ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের অনুমতির বিষয়টিও আলোচনায়।
সব মিলিয়ে, ‘অপারেশন সিঁদুর’-এর অভিজ্ঞতাই রাফালকে ভারতের আকাশরক্ষার মূল স্তম্ভ করে তুলেছে—এমনটাই মনে করছেন প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের বড় অংশ।








