এখনও গ্রীষ্মের চূড়ান্ত সময় আসেনি, অথচ দেশজুড়ে পারদ ৪৫ ডিগ্রির কাছাকাছি। উত্তর থেকে পশ্চিম, এমনকি পূর্ব ভারতও তাপপ্রবাহে জর্জরিত। আবহাওয়া দফতরের সতর্কবার্তা স্পষ্ট—এটা কেবল শুরু। এর নেপথ্যে রয়েছে শক্তিশালী জলবায়ুগত ঘটনা, যার নাম ‘সুপার এল নিনো’। ফলে সামনে আরও কঠিন গরমের ইঙ্গিত মিলছে।
ভারতের বিস্তীর্ণ অংশ জুড়ে এই মুহূর্তে তাপপ্রবাহের দাপট। IMD জানিয়েছে, সাধারণত মে-জুনে যে তাপমাত্রা দেখা যায়, এবার এপ্রিলেই সেই স্তরে পৌঁছে গিয়েছে। রাজধানী দিল্লি-এনসিআর, পঞ্জাব, হরিয়ানা থেকে শুরু করে মহারাষ্ট্র, গুজরাট ও মধ্য প্রদেশে—সব জায়গাতেই তাপমাত্রা ৪৩-৪৫ ডিগ্রির ঘরে ঘোরাফেরা করছে।


মহারাষ্ট্রের আকোলা ৪৫.৬°C, পঞ্জাবের ফরিদকোট ৪৫.২°C, ওড়িশার ঝারসুগুড়া ৪৪.৬°C—এমন চিত্র এখন স্বাভাবিক হয়ে উঠছে। অবাক করার মতো বিষয়, পাহাড়ি রাজ্যহিমাচল প্রদেশেও এপ্রিলেই পারদ ৪১ ডিগ্রি ছুঁয়েছে।
ভারত ‘হটস্পট’ হয়ে উঠছে
জলবায়ু বিশেষজ্ঞদের মতে, চরম তাপমাত্রার বিচারে ভারত দ্রুত একটি ‘হটস্পট’-এ পরিণত হচ্ছে। বিশ্বের উষ্ণতম শহরের তালিকায় একাধিক ভারতীয় শহরের নাম উঠে আসছে নিয়মিত। উত্তর, মধ্য ও পূর্ব ভারতে আগামী দিনে তাপপ্রবাহ আরও বাড়তে পারে বলে সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে।
এই অস্বাভাবিক গরমের প্রভাব পড়ছে জনজীবনে। দুপুরে রাস্তায় বের হওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে বহু মানুষের কাছে। বিভিন্ন রাজ্যে স্কুলের গরমের ছুটি এগিয়ে আনা হয়েছে। অসুস্থতার ঝুঁকিও বাড়ছে—হিটস্ট্রোক, ডিহাইড্রেশন এখন নিত্যসঙ্গী।


‘সুপার এল নিনো’—গরমের বড় কারণ
এই চরম আবহাওয়ার পিছনে বড় কারণ El Niño-এর শক্তিশালী রূপ, অর্থাৎ ‘সুপার এল নিনো’। সাধারণ এল নিনোর তুলনায় এটি অনেক বেশি প্রভাবশালী। প্রশান্ত মহাসাগরের নিরক্ষীয় অঞ্চলে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে অনেকটা বেড়ে গেলে এই পরিস্থিতি তৈরি হয়।
এর ফলে বায়ুমণ্ডলের স্বাভাবিক সঞ্চালন ব্যাহত হয়, যার প্রভাব বিশ্বজুড়ে পড়ে—কোথাও খরা, কোথাও বন্যা, আর ভারতে বাড়ে তাপপ্রবাহ।
ভারতের আবহাওয়ায় প্রভাব
সুপার এল নিনোর প্রভাবে ভারতে বর্ষা দুর্বল হয়ে পড়ে। ফলে বৃষ্টির ঘাটতি দেখা দেয় এবং খরার আশঙ্কা বাড়ে। গ্রীষ্মকাল দীর্ঘ হয়, তাপপ্রবাহের তীব্রতা ও স্থায়িত্ব বেড়ে যায়। কৃষিক্ষেত্রেও এর বড় প্রভাব পড়ে—ধান, আখ, সয়াবিনের মতো ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
পশ্চিমবঙ্গেও বাড়ছে প্রভাব
পশ্চিমবঙ্গেও এই প্রভাব স্পষ্ট। দক্ষিণবঙ্গে বৃষ্টির ঘাটতি দেখা যাচ্ছে, যার ফলে আমন ধানের চাষে সমস্যা তৈরি হচ্ছে। কলকাতা-সহ একাধিক জেলায় তাপমাত্রা ৪০-৪৫ ডিগ্রিতে পৌঁছচ্ছে। শীতকালও ছোট হয়ে আসছে—ডিসেম্বরেও স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি তাপমাত্রা অনুভূত হচ্ছে।
এছাড়া বঙ্গোপসাগরে ঘূর্ণিঝড়ের ধরণেও পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। কম বৃষ্টি হলেও হঠাৎ করে তীব্র নিম্নচাপ তৈরি হওয়ার প্রবণতা বাড়ছে।
সব মিলিয়ে স্পষ্ট, ‘সুপার এল নিনো’ শুধু গরম বাড়াচ্ছে না—এটি জলবায়ুর দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনকেও ত্বরান্বিত করছে। আর তার প্রভাব এখন থেকেই হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে গোটা দেশ।







