সস্তা হতে পারে বিএমডব্লিউ–মার্সিডিজ, কমবে বিদেশি ওয়াইনের দাম! ইউরোপের সঙ্গে ‘মাদার অফ অল ডিলস’ থেকে কী পেতে পারে ভারত

ভারত–ইইউ মুক্ত বাণিজ্যচুক্তি চূড়ান্ত হলে কমতে পারে বিদেশি গাড়ি ও ওয়াইনের দাম, তবে কার্বন ট্যাক্স ও ক্ষুদ্র শিল্প নিয়ে উদ্বেগও বাড়ছে।

নজরবন্দি ডিজিটাল ডেস্ক

দীর্ঘ প্রায় দু’দশক ধরে চলা আলোচনা অবশেষে বাস্তবের মুখ দেখতে চলেছে। ২০০৭ সাল থেকে যে ভারত–ইউরোপীয় ইউনিয়ন মুক্ত বাণিজ্যচুক্তি (FTA) নিয়ে দরকষাকষি চলছে, তা চূড়ান্ত হওয়ার একেবারে দোরগোড়ায়। সব কিছু ঠিকঠাক থাকলে মঙ্গলবারই ‘মাদার অফ অল ডিলস’ নামে পরিচিত এই ঐতিহাসিক চুক্তি নিয়ে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা হতে পারে। এই চুক্তি কার্যকর হলে ভারতের বাজারে উল্লেখযোগ্যভাবে সস্তা হতে পারে ইউরোপীয় বিলাসবহুল গাড়ি ও বিদেশি ওয়াইন—যার সরাসরি প্রভাব পড়বে ভোক্তাদের পকেটে।

তিন দিনের ভারত সফরে রবিবার দিল্লিতে পৌঁছেছেন ইউরোপীয় ইউনিয়ন-এর প্রধান উরসুলা ভন ডার লেয়েন। সোমবার সাধারণতন্ত্র দিবসের কুচকাওয়াজে প্রধান অতিথি হিসেবেও উপস্থিত ছিলেন তিনি। তাঁর সঙ্গে ছিলেন ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট অ্যান্তোনিও কোস্টা। এক্স হ্যান্ডলে উরসুলা লেখেন, “প্রজাতন্ত্র দিবসে প্রধান অতিথি হিসেবে থাকতে পেরে আমি সম্মানিত। একটি সফল ভারত বিশ্বকে আরও স্থিতিশীল, সমৃদ্ধ ও নিরাপদ করে তুলবে।”

সূত্রের খবর, মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি-র সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে বসবেন উরসুলা। সেই বৈঠকের পরেই মুক্ত বাণিজ্যচুক্তি নিয়ে চূড়ান্ত সমঝোতার ঘোষণা হতে পারে।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত মোট ২৭টি দেশের সঙ্গে এই চুক্তির সব শর্ত এখনও প্রকাশ্যে আসেনি। তবে সরকারি সূত্রে জানা গিয়েছে, ১৫ হাজার ইউরোর বেশি আমদানিমূল্যের গাড়ির উপর শুল্ক কমানোর প্রস্তাব দিয়েছে নয়াদিল্লি। বর্তমানে ইউরোপ থেকে আমদানি করা গাড়ির উপর প্রায় ১১০ শতাংশ শুল্ক দিতে হয়। চুক্তি কার্যকর হলে তা কমে প্রায় ৪০ শতাংশে নেমে আসতে পারে। এর ফলে দেশের বাজারে BMWMercedes-Benz-এর মতো ইউরোপীয় গাড়ির দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমতে পারে।

শুধু গাড়ি নয়, বিদেশি ওয়াইনের উপর শুল্কও কমানোর প্রস্তাব রয়েছে। এর ফলে ভারতের বাজারে ইউরোপীয় ওয়াইন আরও সস্তা হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

এর আগে সুইৎজারল্যান্ডের দাভোসে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামে বক্তব্য রাখতে গিয়ে উরসুলা ভন ডার লেয়েন বলেছিলেন, “ভারতের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্যচুক্তি সাক্ষরের একেবারে দোরগোড়ায় আমরা। এই চুক্তি ২ বিলিয়ন মানুষের এক বিশাল বাজার তৈরি করবে, যা বিশ্ব জিডিপির প্রায় এক-চতুর্থাংশের প্রতিনিধিত্ব করবে।” সূত্রের দাবি, ২৪টি অধ্যায়ের মধ্যে ইতিমধ্যেই ২০টি অধ্যায় নিয়ে দু’পক্ষ সহমত হয়েছে।

তবে সব দিক এখনও চূড়ান্ত হয়নি। সম্প্রতি ব্রাসেলসে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদর দফতরে গিয়েছিলেন বাণিজ্যমন্ত্রী পীযূষ গোয়েল। শেষ মুহূর্তে কিছু শর্ত বদলাতেও পারে বলে ইঙ্গিত মিলছে।

জানা গিয়েছে, কৃষিক্ষেত্র এই চুক্তির আওতায় থাকছে না। তবে উৎপাদন, প্রযুক্তি, শক্তিসম্পদ, ওষুধ ও শিল্পপণ্যের মতো ক্ষেত্রগুলি অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। আমেরিকার সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তি না হওয়া এবং পরবর্তী সময়ে শুল্কবাণে ক্ষতিগ্রস্ত ভারতের বাজারের জন্য ইউরোপ একটি বিকল্প ও গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্য হয়ে উঠতে পারে বলেই মনে করছে কেন্দ্র।

তবে চ্যালেঞ্জও কম নয়। ইউরোপের নতুন কার্বন বর্ডার ট্যাক্স নিয়ে উদ্বিগ্ন নয়াদিল্লি। এটি কার্যকর হলে ভারতের ইস্পাত ও অ্যালুমিনিয়াম রপ্তানি ২০ থেকে ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত ব্যয়বহুল হয়ে উঠতে পারে। পাশাপাশি, বিশেষজ্ঞদের মতে এই চুক্তির ফলে ভারতের ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প অসম প্রতিযোগিতার মুখে পড়তে পারে।

সব মিলিয়ে, আন্তর্জাতিক মহলের একাংশের মতে, এই বাণিজ্যচুক্তি ভারতের জন্য এক ধরনের ‘কৌশলগত বিমা’। এটি আমেরিকা ও চিনের উপর নির্ভরতা কমাবে, সাপ্লাই চেইনকে শক্তিশালী করবে এবং প্রতিরক্ষা ও সাইবার নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও সহযোগিতার নতুন দিগন্ত খুলে দিতে পারে।

সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহুর্তে। আমাদের ফলো করুন
Google News Google News

সদ্য প্রকাশিত