পাকিস্তানি গোয়েন্দাদের হানিট্র্যাপে পা দিয়ে দেশের প্রতিরক্ষা সংক্রান্ত স্পর্শকাতর তথ্য পাচারের অভিযোগ উঠল ভারতীয় বায়ুসেনার এক উইং কমান্ডারের বিরুদ্ধে। অভিযোগ, সোশ্যাল মিডিয়ায় পরিচিত এক মহিলার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার সূত্রে ওই আধিকারিক সেনা মোতায়েন, সামরিক গতিবিধি এবং গুরুত্বপূর্ণ নথি সংক্রান্ত তথ্য পাঠাতেন। দিল্লি পুলিশের স্পেশাল সেল তাঁকে গ্রেপ্তার করেছে বলে সংবাদমাধ্যমের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
পুলিশ সূত্রের দাবি, ব্যক্তিগত জীবনের কঠিন সময়েই সোশ্যাল মিডিয়ায় ওই মহিলার সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল অভিযুক্ত আধিকারিকের। প্রথমে বন্ধুত্ব, পরে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি হয়। তদন্তকারীদের অভিযোগ, সেই সম্পর্কের সুযোগ নিয়েই তাঁকে ধীরে ধীরে সংবেদনশীল সামরিক তথ্য সংগ্রহ ও সরবরাহের কাজে ব্যবহার করা হয়েছিল।
অভিযোগ অনুযায়ী, ওই মহিলার সঙ্গে যোগাযোগের পর বায়ুসেনার বিভিন্ন গতিবিধি, সেনা মোতায়েন সংক্রান্ত তথ্য এবং গুরুত্বপূর্ণ নথি ও ছবি-ভিডিয়ো তাঁর কাছে পাঠানো শুরু করেন উইং কমান্ডার। তদন্তকারীদের সন্দেহ, এই তথ্য পরে পাকিস্তানি গোয়েন্দা হ্যান্ডলারদের কাছে পৌঁছে যেত।
শুধু তথ্য পাঠানোই নয়, আরও গুরুতর অভিযোগ উঠেছে তাঁর বিরুদ্ধে। তদন্তকারীদের দাবি, ওই মহিলার কথায় কয়েক জন সহকর্মীর মোবাইল ফোনে একটি অ্যাপ বা স্পাইওয়্যার ইনস্টল করার ব্যবস্থা করেছিলেন তিনি। এর মাধ্যমে ফোনে থাকা তথ্য হাতিয়ে নেওয়া এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের গতিবিধির উপর নজর রাখার চেষ্টা করা হয়েছিল বলে অভিযোগ।
তদন্তকারীদের মতে, যে মহিলার সঙ্গে উইং কমান্ডারের সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল, তাঁর পাকিস্তানি হ্যান্ডলারদের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল। অর্থাৎ গোটা ঘটনাটি শুধুমাত্র ব্যক্তিগত সম্পর্কের বিষয় ছিল না, এর পিছনে একটি সংগঠিত গোয়েন্দা চক্র কাজ করছিল কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
সাম্প্রতিক সময়ে ভারতীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের টার্গেট করে সোশ্যাল মিডিয়া-ভিত্তিক হানিট্র্যাপের অভিযোগ একাধিকবার সামনে এসেছে। অতীতের এমন মামলাতেও পাকিস্তানি গোয়েন্দা অপারেটিভরা ভুয়ো পরিচয়ে ভারতীয় প্রতিরক্ষা কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনের চেষ্টা করেছে বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
এ ক্ষেত্রেও বেশ কিছু দিন ধরে ওই উইং কমান্ডারের গতিবিধির উপর নজর রাখা হচ্ছিল বলে জানা গিয়েছে। বায়ুসেনার অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা শাখার নজরে তাঁর কিছু কার্যকলাপ সন্দেহজনক ঠেকে। এরপর বিষয়টি দিল্লি পুলিশের কাছে জানানো হয় এবং তদন্তকারীদের হাতে কিছু তথ্যপ্রমাণও তুলে দেওয়া হয় বলে রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে।
এর পরেই অভিযুক্ত আধিকারিককে গ্রেপ্তার করা হয়। বর্তমানে তিনি বিচারবিভাগীয় হেফাজতে রয়েছেন বলে সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। তাঁর কাছ থেকে ঠিক কী ধরনের তথ্য বাইরে গিয়েছিল, সেই তথ্য কতটা স্পর্শকাতর এবং আরও কেউ এই চক্রের সঙ্গে যুক্ত কি না—এখন তদন্তের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
ঘটনার গুরুত্ব আরও বেড়েছে কারণ অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন কর্মরত বায়ুসেনার এক উইং কমান্ডার। সামরিক তথ্য সুরক্ষার ক্ষেত্রে তাঁর মতো আধিকারিকের কাছে থাকা নথি বা অপারেশনাল তথ্যের অপব্যবহার জাতীয় নিরাপত্তার জন্য গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তবে তদন্ত সম্পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত অভিযোগগুলিকে প্রমাণিত সত্য হিসেবে দেখা যাবে না।
এই ঘটনায় ফের সামনে এল সোশ্যাল মিডিয়া-ভিত্তিক হানিট্র্যাপের ঝুঁকি। ব্যক্তিগত সম্পর্কের আড়ালে প্রতিরক্ষা কর্মীদের কাছ থেকে তথ্য হাতিয়ে নেওয়ার কৌশল যে এখনও সক্রিয়, এই মামলার অভিযোগ সেই আশঙ্কাকেই আরও জোরালো করেছে। এখন তদন্তে পাকিস্তানি হ্যান্ডলারদের পরিচয়, তথ্য পাচারের পরিমাণ এবং এই নেটওয়ার্কে আরও কেউ জড়িত কি না, তার উত্তর খোঁজা হচ্ছে।



