বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল যখন শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ড রায় ঘোষণা করল, তার কিছুক্ষণের মধ্যেই দেশান্তরী প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী তীব্র প্রতিক্রিয়া জানান। দিল্লিতে আশ্রয়ে থাকা হাসিনা জানিয়েছেন—এই রায় সম্পূর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, এবং তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলি মিথ্যা, সাজানো এবং সরকার–সমর্থিত শক্তির ষড়যন্ত্র। তাঁর কথায়, এই রায় “নিরপেক্ষ বিচার নয়, বরং একটি পক্ষপাতদুষ্ট সিদ্ধান্ত।” (হাসিনাকে ফাঁসি: পাকিস্তান ঘনিষ্ঠতায় কি উগ্রপন্থীদের হাতে বাংলাদেশ? ভারতের নিরাপত্তা-সঙ্কট?)
সোমবার দুপুরে ঢাকায় ট্রাইব্যুনাল পাঁচটি গুরুতর অভিযোগে তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করে ফাঁসির সাজা ঘোষণা করে। মানবতাবিরোধী অপরাধ, গণঅভ্যুত্থানের সময় গুলিচালনার নির্দেশ, উস্কানিমূলক ভাষণ, আবু সাঈদ হত্যার অভিযোগ এবং চানখাঁরপুল ও আশুলিয়ার হত্যাকাণ্ড—প্রতিটি অভিযোগই দায়ী করেছেন বিচারপতিরা। কিন্তু হাসিনার দাবি, “এগুলি সবই রাজনৈতিক প্রতিশোধের অংশ।”
‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত রায়, এক্তিয়ারই নেই!’ মুখ খুললেন নির্ভীক শেখ হাসিনা
অডিয়ো বার্তায় হাসিনা বলেন, “এ রায় সত্যের উপর ভিত্তি করে নয়; এটি একটি পূর্বনির্ধারিত সিদ্ধান্ত। আমি কাউকে হত্যার নির্দেশ দিইনি। আমার বিরুদ্ধে যেসব ভিডিও বা বয়ান দেখানো হয়েছে, তার কোনওটাই প্রামাণ্য নয়।” তিনি আরও যোগ করেন, দেশে গণতন্ত্র ধ্বংসের উদ্দেশ্যে পরিকল্পিত ভাবে তাঁকে এই মামলায় ফাঁসানো হয়েছে।

হাসিনার মতে, বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস এবং তার সমর্থিত প্রশাসনিক অংশ বিশেষ এই রায়ের মাধ্যমে দেশে নতুন ধরনের রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি করতে চাইছে। তিনি বলেন, “বাংলাদেশে আজ বিচারব্যবস্থা স্বাধীন নয়। যারা ক্ষমতা দখল করেছে, তারাই আদালতকে ব্যবহার করছে।”
রায়ের আগের দিনই হাসিনা জানিয়েছিলেন—তিনি জীবন নিয়ে ভয় পান না। তাঁর কথায়, “আল্লা জীবন দিয়েছেন, আল্লাই নেবেন।” কিন্তু রায় ঘোষণার পর তাঁর বার্তা আরও রাজনৈতিক হয়ে উঠেছে। তিনি বলেছেন, “এ রায় জনগণের বিরুদ্ধে। আমার বিরুদ্ধে নয়, সত্যের বিরুদ্ধে রায় দেওয়া হয়েছে।”
প্রবাসে থাকা হাসিনার সমর্থকরাও রায়ের তীব্র সমালোচনা করেছেন। তাঁদের দাবি, বিচারপতিরা যে ৪৫৩ পৃষ্ঠার রায় পড়েছেন, তা মূলত সরকারি ব্যাখ্যার পুনরাবৃত্তি, যেখানে বাস্তব প্রমাণ বা স্বাধীন সাক্ষ্যপ্রমাণ তেমন গুরুত্ব পায়নি।
ব্যাপক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা হাসিনা প্রশ্ন তুলেছেন—
“যদি সত্যিই ন্যায়বিচার করা হতো, তাহলে সাক্ষীদের জবানবন্দি গোপন রাখা হলো কেন? কেন তদন্ত রিপোর্ট প্রকাশ করা হয়নি?”
তিনি অভিযোগ করেন, তাঁকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর থেকেই তাঁকে নীরব করতে প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক চাপ প্রয়োগ করা হচ্ছে।
এই শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ড রায় ইতিমধ্যেই আন্তর্জাতিক মহলে আলোড়ন তুলেছে। ভারতসহ দক্ষিণ এশিয়ার কয়েকটি দেশ ঘটনার দিকে কড়া নজর রাখছে। কারণ, এই রায় শুধু বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নয়—আঞ্চলিক নিরাপত্তা, পাকিস্তান–ঘনিষ্ঠ শক্তির উত্থান এবং ভারতের পূর্ব সীমান্তের স্থিতিশীলতার ওপর দীর্ঘ প্রভাব ফেলতে পারে।
অন্যদিকে ঢাকার রাস্তায় দেখা যাচ্ছে তীব্র নিরাপত্তা। রায় ঘোষণার পর একদিকে সরকারের কড়া সতর্কতা, অন্যদিকে মানুষের মধ্যে আতঙ্ক। আইনজীবী মহল মনে করছে—হাসিনার আইনজীবীরা আন্তর্জাতিক আদালতে যাওয়ার চেষ্টা করতে পারেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই রায়ের ফলে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে চরম মতাদর্শিক বিভাজন আরও তীব্র হবে।
সবশেষে হাসিনার দাবি—“আমি নির্দোষ। বাংলাদেশের সত্যিকারের গণতন্ত্রের জন্য লড়াই আমি চালিয়ে যাব।”







