কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (AI) দ্রুত অগ্রগতি নিয়ে বিতর্কের মধ্যেই এবার সরাসরি সতর্কবার্তা দিলেন গুগল ডিপমাইন্ডের (Google DeepMind) দুই প্রাক্তন গবেষক। বিলাল চুঘতাই এবং জশ এঙ্গেলস—দু’জনেই এজিআই (AGI) নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করার পর সংস্থা ছেড়েছেন। তাঁদের আশঙ্কা, বর্তমান গতিতে এআই-এর উন্নয়ন চলতে থাকলে ভবিষ্যতে মানবজাতির অস্তিত্বই ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
গুগল ডিপমাইন্ডে এজিআই সেফটি এবং অ্যালাইনমেন্ট নিয়ে গবেষণা করতেন বিলাল চুঘতাই। সম্প্রতি নিজের এক্স (X) হ্যান্ডলে চাকরি ছাড়ার কথা জানিয়ে তিনি এআই-এর ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, গুগলে কাজ করার সময় অত্যন্ত কাছ থেকে এআই প্রযুক্তির অগ্রগতির ধারা দেখেছেন তিনি। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই ঝুঁকি নিয়ে তাঁর আশঙ্কা আরও বেড়েছে।
বিলালের মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কারণে মানুষের বিলুপ্তির ঝুঁকি একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তাঁর দাবি, এই সম্ভাব্য পরিণতি এড়ানোর জন্য হাতে হয়তো খুব বেশি সময়ও নেই। সেই কারণেই এআই নিরাপত্তা নিয়ে আরও সতর্ক এবং দায়িত্বশীল পদক্ষেপ প্রয়োজন বলে মনে করছেন তিনি।
প্রায় একই সময়ে গুগল ডিপমাইন্ডের এজিআই সেফটি টিম ছেড়েছেন জশ এঙ্গেলসও। তাঁর ক্ষেত্রে সিদ্ধান্তটি আরও কঠিন ছিল বলে জানিয়েছেন তিনি। কারণ, ডিপমাইন্ডে নিজের কাজ তিনি উপভোগ করতেন। তবুও বর্তমান পরিস্থিতিতে এআই-এর ঝুঁকির মাত্রা এতটাই বেড়েছে বলে তাঁর মনে হয়েছে যে শেষ পর্যন্ত চাকরি ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
দুই গবেষকের বক্তব্য সামনে আসতেই এআই নিরাপত্তা নিয়ে পুরনো বিতর্ক নতুন করে তীব্র হয়েছে। বিশেষ করে যারা সরাসরি অত্যাধুনিক এআই মডেল এবং AGI-এর নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করেছেন, তাঁদের কাছ থেকেই এমন সতর্কবার্তা আসায় বিষয়টি প্রযুক্তি মহলে আলাদা গুরুত্ব পেয়েছে।
এদিকে এআই নিয়ন্ত্রণ নিয়ে আন্তর্জাতিক স্তরেও মতভেদ রয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প (Donald Trump) এআই নিয়ে সম্ভাব্য ঝুঁকি সম্পর্কে আলোচনার মধ্যেও প্রযুক্তির বিকাশ থামিয়ে দেওয়ার পক্ষে নন। বরং মার্কিন সংস্থাগুলি যাতে চিনের তুলনায় এগিয়ে থাকে এবং অত্যাধুনিক এআই মডেল তৈরি করতে পারে, সেই প্রতিযোগিতা অব্যাহত রাখার উপর জোর দিয়েছেন তিনি।
অন্যদিকে প্রযুক্তি দুনিয়ার একাংশ মনে করছে, শুধু এআই উন্নয়নের গতি বাড়ানো নয়, তার সঙ্গে নিরাপত্তা ব্যবস্থাও সমানতালে শক্তিশালী করা জরুরি। উন্নত এআই সিস্টেম মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে কী ধরনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে, তা নিয়েই মূলত এই বিতর্ক।
সম্প্রতি অ্যানথ্রপিকের (Anthropic) প্রধান দারিও আমোদি (Dario Amodei) একটি ব্লগে এআই-এর উন্নয়নের গতি কিছুটা ধীর করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন। তাঁর বক্তব্যে মূলত নিরাপত্তা এবং সম্ভাব্য ঝুঁকি সামলানোর বিষয়টিই গুরুত্ব পেয়েছিল।
এর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ওপেনএআই (OpenAI)-এর প্রধান স্যাম অল্টম্যান (Sam Altman) এবং এক্সএআই (xAI)-এর প্রধান এলন মাস্ক (Elon Musk) সামাজিক মাধ্যমে ওই বক্তব্যের সঙ্গে সহমত প্রকাশ করেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে এআই-এর ক্ষমতা বৃদ্ধির সঙ্গে নিরাপত্তা এবং নিয়ন্ত্রণের ভারসাম্য কীভাবে রাখা হবে, সেই প্রশ্ন আরও জোরালো হয়েছে।
তবে এআই মানুষের বিলুপ্তির কারণ হবে কি না, তা নিয়ে বিজ্ঞানী ও প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মধ্যে কোনও সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত নেই। এটি মূলত একটি সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ ঝুঁকি নিয়ে বিতর্ক। কিন্তু গুগল ডিপমাইন্ডের মতো প্রতিষ্ঠানে এজিআই নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা দুই গবেষকের পদত্যাগ সেই বিতর্ককে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।
এখন প্রশ্ন একটাই—এআই-এর ক্ষমতা যত দ্রুত বাড়ছে, তার নিরাপত্তা ব্যবস্থাও কি সেই একই গতিতে এগোচ্ছে? প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে এই প্রশ্নের উত্তরই আগামী দিনে এআই দুনিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয় হয়ে উঠতে পারে।



