পাকিস্তানের সেনা রাজনীতির ইতিহাসে নতুন অধ্যায়। স্থলসেনা প্রধানের পদ ছাড়িয়ে এবার পুরো সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক (Chief of Defence Forces) হলেন ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির (Asim Munir)। বৃহস্পতিবার পাকিস্তানের জাতীয় সংসদে পাশ হয়েছে সেই বিশেষ সংবিধান সংশোধনী বিল (Constitution Amendment Bill), যা কার্যত মুনিরের হাতে দেশের সর্বোচ্চ সামরিক ক্ষমতা তুলে দিয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ (Shehbaz Sharif)-এর নেতৃত্বাধীন সরকার সংবিধানের ২৪৩ নম্বর ধারা সংশোধন করে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ পর্যন্ত পাকিস্তানে সশস্ত্র বাহিনীর তিনটি শাখা — স্থল, নৌ ও বায়ুসেনা —- প্রত্যেকের আলাদা প্রধান থাকলেও, তাঁদের উপরে কোনও পদ ছিল না। এবার মুনিরের জন্য তৈরি হল ‘Chief of Defence Forces’ বা সেনা সর্বাধিনায়ক পদটি, যা দেশের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সর্বময় নিয়ন্ত্রণ দেবে তাঁকে।
মুনিরের জন্য বিশেষ আইনি সুরক্ষা
এই নতুন পদে উন্নীত করার পাশাপাশি শরিফ সরকার মুনিরের জন্য তৈরি করেছে এক বিশেষ আইনি রক্ষাকবচ (Legal Immunity Clause)। সংশোধনী বিলে বলা হয়েছে— “Chief of Defence Forces-এর বিরুদ্ধে কোনও আদালতে মামলা করা যাবে না।” অর্থাৎ, দেশের কোনও আদালত মুনিরের সিদ্ধান্ত বা কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারবে না।

এই পদক্ষেপ পাকিস্তানের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলে তীব্র বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। বিরোধীদের অভিযোগ, “এটি দেশের সেনাবাহিনীকে আরও শক্তিশালী এবং বিচারব্যবস্থাকে দুর্বল করার সরাসরি চক্রান্ত।”
দ্বিতীয় ফিল্ড মার্শাল হিসেবে ইতিহাস গড়লেন মুনির
আসিম মুনির পাকিস্তানের সেনা ইতিহাসে দ্বিতীয় ব্যক্তি যিনি ফিল্ড মার্শাল (Field Marshal) পদে উন্নীত হলেন। এর আগে এই সম্মান পেয়েছিলেন প্রাক্তন সেনা শাসক আয়ুব খান (Ayub Khan)। ফলে, পাকিস্তানের সামরিক প্রভাব এখন কার্যত এক ব্যক্তির হাতে কেন্দ্রীভূত।
সুপ্রিম কোর্টের ক্ষমতা ছাঁটাইয়ের বিলও পাশ
একই দিনে পাকিস্তান পার্লামেন্ট আরও একটি বিতর্কিত বিল পাশ করেছে— সুপ্রিম কোর্টের ক্ষমতা কমানোর বিল (Judicial Power Reduction Bill)। নতুন বিলে বলা হয়েছে, সংবিধান সংক্রান্ত মামলার এখতিয়ার আর সুপ্রিম কোর্টের হাতে থাকবে না। সেই দায়িত্ব যাবে নতুন গঠিত “Constitutional Court”-এর হাতে।
সরকারি সূত্রে বলা হয়েছে, এই পদক্ষেপ নাকি দেশের বিচারব্যবস্থাকে “কার্যকর ও দ্রুতগামী” করতে সাহায্য করবে। কিন্তু বিরোধী দল পিটিআই (Pakistan Tehreek-e-Insaf) এবং মানবাধিকার সংগঠনগুলির দাবি, “এটি আসলে গণতন্ত্রের গলা টিপে হত্যা।”
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতামত
বিশ্লেষকরা বলছেন, এই দুটি বিলের মাধ্যমে শরিফ সরকার সেনাবাহিনীর সঙ্গে আপোষমূলক সম্পর্ক আরও মজবুত করতে চাইছে। সামরিক বাহিনীর প্রভাব পাকিস্তানের রাজনীতিতে বহু পুরনো। অতীতে বিভিন্ন সময় সেনা শাসন ও সামরিক অভ্যুত্থান পাকিস্তানের গণতন্ত্রকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।
তাঁদের মতে, এই নতুন পদ সৃষ্টির মাধ্যমে পাকিস্তানে এখন এমন এক “Super Military Command Structure” তৈরি হয়েছে, যেখানে প্রধানমন্ত্রী পর্যন্ত প্রতিরক্ষা নীতিতে প্রান্তিক ভূমিকা পালন করবেন।
বিরোধীদের কণ্ঠে তীব্র প্রতিবাদ
পিটিআই-এর নেতা ও প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান এই পদক্ষেপকে “Constitutional Coup” বলে অভিহিত করেছেন। তাঁর দাবি, “এই সরকার সেনাবাহিনীকে রাজনৈতিক ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে। মুনিরের জন্য আলাদা পদ সৃষ্টি মানে গণতন্ত্রের শেষকৃত্য।”
অন্যদিকে, ক্ষমতাসীন দলের নেতারা বলছেন, “মুনিরের নেতৃত্বে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আরও ঐক্যবদ্ধ ও আধুনিক হবে।”
বিশ্বমঞ্চে প্রতিক্রিয়া
আন্তর্জাতিক মহলেও এই সিদ্ধান্ত নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। বিশেষ করে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (HRW) এবং অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বলেছে, “এটি পাকিস্তানে সেনাবাহিনীর অতি-প্রভাবকে আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেবে।”







