পশ্চিমবঙ্গে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে বিরোধীদের তীব্র অভিযোগ থাকলেও রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচনের উপযুক্ত পরিবেশ রয়েছে— এমনই স্পষ্ট বার্তা দিল নির্বাচন কমিশন। রাজ্যের পুলিশ ও প্রশাসনের শীর্ষ আধিকারিকদের সঙ্গে দীর্ঘ বৈঠকের পর কমিশনের ফুল বেঞ্চ জানিয়েছে, কোথাও কোথাও কিছু সমস্যা থাকলেও সামগ্রিকভাবে ভোট করাতে কোনও বাধা দেখছে না তারা। পাশাপাশি কমিশনের দাবি, ভোটার তালিকার প্রায় ৬০ লক্ষ তথ্য যাচাইয়ের কাজও সময়মতো সম্পূর্ণ করা সম্ভব।
সোমবার কলকাতায় রাজ্যের ২৩ জেলার জেলাশাসক, পুলিশ সুপার এবং বিভিন্ন কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সংস্থার আধিকারিকদের সঙ্গে বৈঠক করেন মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের নেতৃত্বে কমিশনের ফুল বেঞ্চ। দীর্ঘ আলোচনার পর কমিশনের পর্যবেক্ষণ, পশ্চিমবঙ্গে কিছু প্রশাসনিক ও আইনশৃঙ্খলাজনিত সমস্যা থাকলেও তা ভোট পরিচালনার ক্ষেত্রে বড় বাধা নয়।

কমিশনের এক আধিকারিকের কথায়, “অনেক রাজ্যেই ভোটের আগে কিছু সমস্যা থাকে। কিন্তু সেই কারণে বলা যায় না যে ভোটের পরিস্থিতি নেই। প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনায় আমরা সন্তুষ্ট।”
বিরোধীদের অভিযোগ, কমিশনের জবাব
সোমবার সকালে রাজ্যের আটটি স্বীকৃত রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিদের সঙ্গেও বৈঠক করে কমিশন। সেখানে বিরোধী দলগুলি রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে। শুধু আশ্বাস নয়, কমিশন আদৌ শান্তিপূর্ণ নির্বাচন করাতে পারবে কি না— সেই প্রশ্নও তোলা হয়।
তবে কমিশনের বক্তব্য স্পষ্ট— শান্তিপূর্ণ নির্বাচন নিশ্চিত করতে সব রকম পদক্ষেপ নেওয়া হবে।


কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন নিয়ে ব্যাখ্যা
ভোট ঘোষণার আগেই রাজ্যে কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। এই নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও কমিশনের ব্যাখ্যা, এটি কোনও অস্বাভাবিক বিষয় নয়।
কমিশনের এক আধিকারিক জানান, “শুধু পশ্চিমবঙ্গ নয়, অন্য রাজ্যেও প্রয়োজনে ভোটের আগে কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন করা হয়। এতে ভোটারদের মধ্যে আস্থা বাড়ে।”

তবে কমিশনের অভিযোগ, কিছু ক্ষেত্রে রাজ্য সরকার কমিশনের নির্দেশ মেনে চলেনি এবং প্রশাসনিক স্তরে সংঘাতের পরিস্থিতিও তৈরি হয়েছে। যদিও কমিশনের দাবি, আদর্শ আচরণবিধি চালু হলে পুরো প্রশাসনই কমিশনের অধীনে চলে আসবে।
৬০ লক্ষ ভোটারের তথ্য যাচাই
চূড়ান্ত ভোটার তালিকার আগে প্রায় ৬০ লক্ষ ৬ হাজার নাম এখনও যাচাইয়ের পর্যায়ে রয়েছে। এই নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও কমিশনের দাবি, পর্যাপ্ত সময় রয়েছে।
সূত্রের খবর, বর্তমানে প্রতিদিন প্রায় এক লক্ষ করে আবেদন নিষ্পত্তি হচ্ছে। কমিশনের বক্তব্য, ভোট ঘোষণার পরেও প্রার্থীদের মনোনয়ন জমা দেওয়ার শেষ দিন পর্যন্ত যোগ্য ভোটারদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব হবে।
প্রশাসনিক বৈঠকে কড়া বার্তা
সোমবারের বৈঠকে একাধিক প্রশাসনিক আধিকারিক কমিশনের ভর্ৎসনার মুখেও পড়েন। সূত্রের খবর, রাজ্যের ডিজি (আইনশৃঙ্খলা) বিনীত গোয়েলকে রাজ্যে মাদক নিয়ন্ত্রক উপদেষ্টা কমিটি না থাকা নিয়ে প্রশ্ন করেন মুখ্য নির্বাচন কমিশনার।
কমিশনের বার্তা স্পষ্ট— প্রশাসনিক গাফিলতি বরদাস্ত করা হবে না। জেলাশাসক থেকে পুলিশ কমিশনার— প্রত্যেকের কাজের ‘ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট’ রয়েছে এবং প্রয়োজনে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া, বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ, আবগারি ও মাদক নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রতিনিধিরাও কমিশনের কড়া সতর্কবার্তা পান বলে সূত্রের খবর।
রাজনৈতিক বৈঠকে সামান্য উত্তেজনা
রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকে একটি মুহূর্তে উত্তেজনা তৈরি হয়। তৃণমূলের মন্ত্রী চন্দ্রিমা ভট্টাচার্যের বক্তব্যের ধরন নিয়ে কমিশনের সঙ্গে কিছুটা বাকবিতণ্ডা হয় বলে জানা যায়। পরে কলকাতার মেয়র ফিরহাদ হাকিম পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করেন।
কমিশন সূত্রে খবর, ওই ঘটনাটি বাদ দিলে সামগ্রিকভাবে বৈঠক ইতিবাচকই ছিল।
ভোটের দফা নিয়ে মতভেদ
সূত্রের খবর, বিজেপি-সহ প্রায় সব বিরোধী দল এক বা সর্বোচ্চ দুই দফায় ভোটের দাবি জানিয়েছে। তবে তৃণমূল কংগ্রেস এ বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনও প্রস্তাব দেয়নি।
সম্ভাব্য ভোট ঘোষণা
কমিশন সূত্রে খবর, আগামী ১৫ বা ১৬ ফেব্রুয়ারি পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের নির্ঘণ্ট ঘোষণা হতে পারে। মঙ্গলবার মুখ্যসচিব নন্দিনী চক্রবর্তীর সঙ্গে বৈঠকের পর কমিশনের ফুল বেঞ্চ সাংবাদিক বৈঠক করবে।
পশ্চিমবঙ্গের পাশাপাশি অসম, কেরল, তামিলনাড়ু ও পুদুচেরিতেও বিধানসভা নির্বাচন হওয়ার কথা। কমিশনের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, প্রশাসনিক দিক থেকে সবচেয়ে ভাল অবস্থায় রয়েছে কেরল।







