একুশের প্রথম প্রহরে কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে শ্রদ্ধা নিবেদন ঘিরে আবেগ ও রাজনীতির মেলবন্ধন—ভাষা শহিদদের স্মরণে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জানিয়ে দিলেন, একাত্তরের চেতনা এখনো অটুট। সাম্প্রতিক সময়ে জামায়াতের ভূমিকা নিয়ে বিতর্কের আবহে তাঁর উপস্থিতি ও বক্তব্য রাজনৈতিক তাৎপর্য বহন করছে। ইতিহাস, ভাষা ও জাতীয়তাবোধের প্রশ্নে সরকারের অবস্থান স্পষ্ট করল একুশের মঞ্চ।
শুক্রবার রাত ১২টা ১ মিনিটে রাষ্ট্রপতি মহম্মদ সাহাবুদ্দিন কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণের মাধ্যমে দিবসের সূচনা করেন। তার কিছুক্ষণের মধ্যেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শহিদ মিনারে শ্রদ্ধা জানান। নতুন শপথ নেওয়ার পর এটিই তাঁর প্রথম একুশে ফেব্রুয়ারি পালন। পর্যবেক্ষকদের মতে, এই উপস্থিতি ছিল কেবল আনুষ্ঠানিকতা নয়—বরং সাম্প্রতিক রাজনৈতিক টানাপোড়েনের প্রেক্ষাপটে একটি স্পষ্ট বার্তা।


গত দেড় বছরে বাংলাদেশে বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও অস্মিতা নিয়ে বিতর্ক তীব্র হয়েছে। বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামীর ভূমিকা ঘিরে রাজনৈতিক মহলে প্রশ্ন উঠেছে। এই পরিস্থিতিতে একুশের মঞ্চে দাঁড়িয়ে তারেক রহমান কার্যত স্মরণ করিয়ে দিলেন—বাংলা ভাষার জন্য আত্মদানই বাংলাদেশের রাষ্ট্রচেতনার ভিত্তি।

শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে ভাষা শহিদদের স্মরণে বিশেষ দোয়ায় অংশ নেন প্রধানমন্ত্রী। পরে মন্ত্রিপরিষদের সদস্যরা তাঁর নেতৃত্বে পুষ্পার্ঘ অর্পণ করেন। শনিবার দিনভর বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনসহ সর্বস্তরের মানুষ শহিদ মিনারে শ্রদ্ধা জানানোর কথা রয়েছে। উল্লেখযোগ্যভাবে, ইতিহাসে প্রথমবারের মতো জামায়াতে ইসলামের নেতা-কর্মীরাও এদিন শহিদ মিনারে শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন—যা নতুন রাজনৈতিক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
ভাষা আন্দোলনের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
ভাষা আন্দোলনের সূচনা হয় ১৯৪৭ সালের নভেম্বর-ডিসেম্বরে ঢাকায়। ১৯৪৮ সালের মার্চে আন্দোলন সীমিত আকারে বিস্তার লাভ করে। চূড়ান্ত বিস্ফোরণ ঘটে ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি, যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ১৪৪ ধারা ভেঙে মিছিল বের করলে পুলিশ গুলি চালায়। শহিদ হন কয়েকজন ছাত্র। পরদিন ২২ ফেব্রুয়ারি সর্বস্তরের মানুষ রাজপথে নেমে প্রতিবাদ জানান। মেডিক্যাল কলেজ হোস্টেল প্রাঙ্গণে গায়েবি জানাজা অনুষ্ঠিত হয়।


২৩ ফেব্রুয়ারি রাতারাতি একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হলেও ২৬ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান সরকার তা ভেঙে দেয়। কিন্তু দমন-পীড়ন আন্দোলনকে স্তব্ধ করতে পারেনি; বরং ভাষা আন্দোলন আরও তীব্র হয়।
১৯৫৪ সালের প্রাদেশিক নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের বিজয়ের পর ৭ মে গণপরিষদে বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। ১৯৫৬ সালের সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে বাংলা পাকিস্তানের দ্বিতীয় রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা পায়। পরবর্তীতে ১৯৮৭ সালে ‘বাংলা ভাষা প্রচলন বিল’ পাস হয়ে সরকারি কার্যক্রমে বাংলা ব্যবহারের আইনি ভিত্তি সুদৃঢ় হয়। আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আসে ২০১০ সালে, যখন ভাষা আন্দোলনের গুরুত্ব বৈশ্বিক পরিসরে স্বীকৃত হয়।
একুশের এই প্রহরে তাই কেবল শ্রদ্ধা নয়, ইতিহাসের পুনর্পাঠও জরুরি হয়ে উঠেছে—যেখানে ভাষা, স্বাধীনতা ও জাতীয় চেতনা অবিচ্ছেদ্য।
সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে
Google News এবং Google Discover-এ নজরবন্দি-কে Follow করে রাখুন।



