অর্ক সানা, সম্পাদক (নজরবন্দি): পশ্চিমবঙ্গের বাম রাজনীতি, বিশেষত সিপিআইএম, একদা যে জমি দখল করে রেখেছিল তা আজ প্রায় মরীচিকা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০১১ সালে ক্ষমতা হারানোর পর থেকে দলটি যেন একটি গভীর সংকটের মধ্য দিয়ে চলছে। একের পর এক নির্বাচনে জামানত বাজেয়াপ্ত হচ্ছে, কখনও তৃতীয় স্থান, কখনও চতুর্থ। গতকাল, ২৩ নভেম্বর ২০২৪-এ ঘোষিত ছ’টি উপনির্বাচনের ফলাফলও এই বাস্তবতাকে সামনে এনেছে। প্রশ্ন হল, এই পরাজয়ের দায় মানুষের ভুল নাকি দলের ব্যর্থ কৌশল?
বাম দলগুলির এখন এমন এক চিত্র যেখানে মানুষের কাছে দলটির গ্রহণযোগ্যতা কমে আসছে। দলীয় নেতৃত্বের বক্তব্য, মানুষ তাদের ভুল বুঝছে। কিন্তু বাস্তবে কি তাই? বরং, মানুষের প্রতি দলের এই মনোভাব অনেকাংশে তাঁদের জনসংযোগের অভাবকেই তুলে ধরে।


জোট রাজনীতির ব্যর্থতা
ক্ষমতায় ফেরার উদ্দেশ্যে সিপিআইএম বিভিন্ন সময় কংগ্রেস, আইএসএফ, এমনকি সিপিআইএমএল-এর মতো দলগুলির সঙ্গে জোট বেঁধেছে। কিন্তু এই জোট রাজনীতিও বাম দলগুলির পক্ষে কাজ করেনি। মহম্মদ সেলিমের মত শীর্ষ নেতা জয়ের স্বাদ পাওয়ার জন্যে কখনও আব্বাস সিদ্দিকির হাত ধরে ভোটে লড়তে যাচ্ছেন হুগলীর চণ্ডীতলায়, আবার কখনও ভোটে জিতে সংসদ হওয়ার ইচ্ছায়, অধীর চৌধুরীর হাত ধরে ভোট লড়তে চলে যান মুর্শিদাবাদ। কিন্তু ঐযে বিধি বাম। সব ক্ষেত্রেই পরাজয়।
মানুষের মনের কথা বুঝতে না পারলে, শুধুমাত্র কৌশলগত জোটের মাধ্যমে নির্বাচনে সাফল্য পাওয়া সম্ভব নয়। মানুষ তাঁদের কাছাকাছি থাকা এমন দলকে বেছে নেয় যারা তাঁদের দৈনন্দিন সমস্যাগুলির সমাধান করতে পারে এবং বিশ্বাসযোগ্য নেতৃত্ব দিতে পারে।
আদর্শ বনাম আধুনিক কৌশল
বাম দলগুলি যে আদর্শ নিয়ে কাজ করে, তা নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু মানুষের মন জয় করতে হলে শুধু আদর্শ দিয়ে হবে না, প্রয়োজন জনসংযোগের আধুনিক কৌশল এবং মানুষের বাস্তব সমস্যাগুলি বুঝে সেই অনুযায়ী কাজ করা।


আজকের দিনে বাম নেতাদের মধ্যে যে অতিপণ্ডিত ভাব ও সবজান্তা মনোভাব রয়েছে, তা ভোটারদের কাছে দলকে দুর্বল এবং অধরা করে তুলেছে। বাম নেতৃত্বকে বুঝতে হবে যে, সাধারণ মানুষের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করতে হলে তাঁদের আরও নম্র এবং বাস্তববাদী হতে হবে।
মানুষের জন্য কাজ করাই মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত
সিপিআইএমকে তাদের রাজনীতির মূল কেন্দ্রে ফিরিয়ে আনতে হলে মানুষের বিশ্বাস ফেরানোর ওপর জোর দিতে হবে। তাঁদের বোঝাতে হবে যে দল এখনও মানুষের জন্য লড়াই করতে প্রস্তুত। মুখে ‘মানুষের কথা’ বলার পাশাপাশি সেই কথার বাস্তব রূপায়ণও করতে হবে। আমি সব জানি, আমিই পণ্ডিত বাকিরা মূর্খ এটা প্রমাণ করার চেষ্টা বন্ধ না করলে, বাম দলগুলির পুনরুজ্জীবন আরও দীর্ঘায়িত হবে।
উপসংহার
সিপিআইএমের বর্তমান অবস্থা শুধুমাত্র দলের জন্যই নয়, বরং রাজ্যের রাজনৈতিক ভারসাম্যের জন্যও উদ্বেগজনক। দলটি যদি সত্যিই মানুষের জন্য কাজ করতে চায়, তবে তাদের সাংগঠনিক পরিবর্তন, আদর্শিক পুনর্মূল্যায়ন এবং জনসংযোগের নতুন কৌশল গ্রহণ করতে হবে। তা না হলে, বাম রাজনীতি শুধু অতীতের একটি অধ্যায় হিসেবেই রয়ে যাবে। জানি এই লেখা পড়ে অনেকেরই মজ্জা ভেদ করে হাড়ে লাগবে এবং সর্বহারার দলের সহিষ্ণু কপিতয় বাম কর্মী বা সমর্থক কিছুক্ষণের জন্যে অসহিষ্ণু হয়ে পড়বেন। কিন্তু এই ধরণের বাম কর্মী সমর্থক ছাড়া লাল পতাকার লক্ষ লক্ষ আসল সমর্থক-কমরেড যারা আছেন এ লেখা তাঁদের মনের কথা…।







