ভারতে ধীরে ধীরে বাড়ছে E20 পেট্রল-এর ব্যবহার। কিন্তু এখনও বহু গাড়ি ও বাইক মালিকের মনে একই প্রশ্ন—E20 পেট্রল কি ইঞ্জিনের ক্ষতি করে? মাইলেজ কি সত্যিই কমে যায়? পুরোনো গাড়িতে এটি ব্যবহার করা নিরাপদ কি না? এই সব প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন ভারত পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন লিমিটেড (BPCL)-এর প্রাক্তন সিনিয়র এক্সিকিউটিভ এবং এনার্জি পলিসি ও বিকল্প জ্বালানি গবেষক সমীরণ মজুমদার। তাঁর ব্যাখ্যা অনুযায়ী, আতঙ্কের কারণ নেই, তবে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অবশ্যই মাথায় রাখতে হবে।
E20 পেট্রল বলতে এমন একটি জ্বালানিকে বোঝায়, যেখানে ৮০ শতাংশ পেট্রল এবং ২০ শতাংশ ইথানল (Ethanol) মেশানো থাকে। ‘E20’-এর ‘E’ অর্থ Ethanol এবং ‘20’ বোঝায় ২০ শতাংশ ইথানলের উপস্থিতি। ভারতের জ্বালানি নীতির অংশ হিসেবে অপরিশোধিত তেলের আমদানির উপর নির্ভরতা কমানো এবং পরিবেশবান্ধব বিকল্প জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর লক্ষ্যেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বিশেষজ্ঞ সমীরণ মজুমদারের মতে, বর্তমানে বাজারে আসা অধিকাংশ BS6 এবং E20-compatible গাড়ি ও মোটরবাইক এই ধরনের জ্বালানি ব্যবহারের উপযোগী করেই তৈরি করা হয়েছে। তাই আধুনিক গাড়িতে সাধারণভাবে ইঞ্জিনের ক্ষতির আশঙ্কা খুবই কম। তবে যেসব পুরোনো গাড়ি E20-র জন্য নকশা করা হয়নি, সেগুলিতে রাবারের পাইপ, গ্যাসকেট, সিল বা ফুয়েল সিস্টেমের কিছু অংশ তুলনামূলক দ্রুত ক্ষয় হতে পারে। তাই পুরোনো গাড়ির ক্ষেত্রে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
অনেকেরই ধারণা, E20 ব্যবহার করলে গাড়ির মাইলেজ কমে যায়। বিশেষজ্ঞের ব্যাখ্যায়, এই ধারণার বাস্তব ভিত্তি রয়েছে। কারণ ইথানলের শক্তি উৎপাদন ক্ষমতা (Energy Density) পেট্রলের তুলনায় কম। ফলে একই পরিমাণ জ্বালানি ব্যবহার করলেও E20 থেকে কিছুটা কম শক্তি পাওয়া যায়। এর প্রভাবে প্রায় ৩ থেকে ৪ শতাংশ পর্যন্ত মাইলেজ কমতে পারে। তবে এই পার্থক্য গাড়ির ধরন, চালানোর অভ্যাস এবং রাস্তার অবস্থার উপরও নির্ভর করে।
E20 নিয়ে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল ইথানলের হাইগ্রোস্কোপিক (Hygroscopic) বৈশিষ্ট্য। অর্থাৎ, এটি বাতাস থেকে আর্দ্রতা বা জল শোষণ করতে পারে। বিশেষজ্ঞের মতে, এর ফলে কিছু পুরোনো গাড়িতে ফুয়েল ট্যাঙ্কে জল জমা, ট্যাঙ্কের তলায় জমে থাকা স্লাজ আলগা হয়ে ফুয়েল লাইনে প্রবেশ করা কিংবা বিরল ক্ষেত্রে ফুয়েল ফিল্টার বা ইনজেক্টরে সমস্যা তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা থাকতে পারে। তবে তিনি স্পষ্ট করেছেন, এই সমস্যাগুলি সব গাড়ির ক্ষেত্রে দেখা যাবে—এমন কোনও নির্দিষ্ট নিয়ম নেই।
পরিবেশের দিক থেকেও E20-কে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। ইথানল মিশ্রিত জ্বালানির ব্যবহার বাড়লে অপরিশোধিত তেলের আমদানি কমানো সম্ভব হবে এবং দীর্ঘমেয়াদে কার্বন নিঃসরণও কমানো যাবে। ভারতের বিকল্প জ্বালানি নীতিতে E20-র পাশাপাশি ভবিষ্যতে সৌরশক্তি, বায়ুশক্তি এবং গ্রিন হাইড্রোজেনের মতো জ্বালানির উপরও জোর দেওয়া হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞের পরামর্শ, E20 ব্যবহার নিয়ে অযথা আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই। তবে গাড়ির প্রস্তুতকারক সংস্থার নির্দেশিকা অবশ্যই মেনে চলতে হবে। নিয়মিত অনুমোদিত সার্ভিস সেন্টারে সার্ভিসিং করানো, ফুয়েল সিস্টেম পরীক্ষা করা এবং প্রয়োজনে রাবারের পাইপ, সিল বা গ্যাসকেট পরিবর্তন করা বাঞ্ছনীয়। বিশেষ করে পুরোনো গাড়ির মালিকদের ক্ষেত্রে এই বিষয়গুলিতে বাড়তি সতর্কতা রাখাই দীর্ঘমেয়াদে নিরাপদ।



