চোরবাগান সর্বজনীনের পুজো মণ্ডপে মর্মান্তিক দুর্ঘটনার পর পুজোর নিরাপত্তা নিয়ে আরও সতর্ক হলেন কলকাতার পুজো উদ্যোক্তারা। দর্শনার্থীদের ভিড় সামলানো এবং মণ্ডপের ভিতরে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে পুজো কমিটিগুলির জন্য ১০ দফা নির্দেশিকা জারি করল ফোরাম ফর দুর্গোৎসব। রবিবার নেতাজি ইন্ডোরে পুজো কমিটিগুলির সঙ্গে বৈঠকে এই নির্দেশগুলি জানানো হয়।
নির্দেশিকায় সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য সিদ্ধান্ত, মণ্ডপের ভিতরে সেলফি তোলা এবং ভিডিয়ো করা নিষিদ্ধ করতে হবে। দর্শনার্থীদের উদ্দেশে মাইকে লাগাতার এই ঘোষণা চালানোর দায়িত্বও দেওয়া হয়েছে পুজো কমিটিগুলিকে। পাশাপাশি প্রবেশপথে স্বেচ্ছাসেবক মোতায়েন, বৃষ্টির জন্য রেনকোট রাখা এবং জরুরি পরিস্থিতিতে অ্যাম্বুল্যান্সের ব্যবস্থা করার উপর জোর দেওয়া হয়েছে।
মণ্ডপে সেলফি ও ভিডিয়ো নয়
ফোরাম ফর দুর্গোৎসবের নির্দেশ অনুযায়ী, মণ্ডপের ভিতরে সেলফি তোলা বা ভিডিয়ো করা যাবে না। দর্শনার্থীদের এই নিয়ম সম্পর্কে সচেতন করতে মাইকে বারবার ঘোষণা করতে হবে পুজো কমিটিগুলিকে।
প্রবেশপথে স্বেচ্ছাসেবক অথবা ক্লাবের সদস্য রাখাও বাধ্যতামূলক করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। তাঁদের প্রধান দায়িত্ব হবে ভিড় নিয়ন্ত্রণ করা এবং দর্শনার্থীদের নিরাপত্তার দিকে নজর রাখা। এই কাজে যাতে কোনও খামতি না থাকে, সে বিষয়েও জোর দেওয়া হয়েছে।
প্রতিটি ক্লাবে ১০টি রেনকোট, জোনে অ্যাম্বুল্যান্স
বৃষ্টির সময় দর্শনার্থীদের ভিড় যাতে মণ্ডপের ভিতরে বিপজ্জনকভাবে জমে না যায়, সেই পরিস্থিতি সামলানোর জন্য প্রতিটি ক্লাবকে ১০টি করে রেনকোট রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এই রেনকোটের খরচ ফোরাম ফর দুর্গোৎসব বহন করবে বলে জানানো হয়েছে।
পুজোর সময় জরুরি চিকিৎসা পরিষেবা নিশ্চিত করতেও উদ্যোগী হয়েছে ফোরাম। প্রতিটি জোনে অ্যাম্বুল্যান্সের ব্যবস্থা করা হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। কোথাও রাস্তায় গর্ত থাকলে তা দ্রুত বুজিয়ে ফেলার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে। পুজোর ভিড়ের মধ্যে রাস্তার গর্ত বা চলাচলের বাধা দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়াতে পারে, তাই এই বিষয়েও সতর্ক থাকার কথা বলা হয়েছে।
নিজের এলাকাতেই থাকতে হবে ক্লাবের সদস্যদের
নির্দেশিকায় ক্লাবের সদস্যদের চলাফেরা নিয়েও বার্তা দেওয়া হয়েছে। ক্লাবের ব্যাচ পরে অন্য পুজো মণ্ডপে ঘুরে বেড়ানো যাবে না বলে জানানো হয়েছে। সদস্যদের নিজেদের এলাকার পুজোর দায়িত্বে থাকতে বলা হয়েছে, যাতে প্রয়োজনের সময় তাঁরা ভিড় সামলানো ও নিরাপত্তার কাজে সাহায্য করতে পারেন।
পুজো পরিচালনা এবং আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করার কথাও বলেছে ফোরাম। পুজো কমিটিগুলিকে এই বিষয়ে সক্রিয় থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশ অনুযায়ী প্রতিটি ক্লাবকে ওয়াকিটকি রাখার অনুরোধ জানানো হয়েছে, যাতে জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত যোগাযোগ করা যায়।
কোনও পুজো কমিটি রক্তদান শিবির আয়োজন করতে চাইলে ফোরামের তরফে সব রকম সাহায্য করা হবে বলেও জানানো হয়েছে।
চোরবাগান বিপর্যয়ের পর নিরাপত্তায় বাড়তি নজর
শনিবার সন্ধ্যায় চোরবাগান সর্বজনীনের পুজো মণ্ডপে বিপুল ভিড়ের মধ্যে হুড়োহুড়ির পরিস্থিতি তৈরি হয়। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এই ঘটনায় ১৯ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং বহু মানুষ আহত হয়েছেন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, সেই সময় বৃষ্টি হচ্ছিল এবং রাস্তায় যানজট ছিল। বৃষ্টি থেকে বাঁচতে কিছু দর্শনার্থী মণ্ডপের ভিতরে ঢোকার চেষ্টা করছিলেন বলে জানা গিয়েছে। এর মধ্যেই ভিড়ের চাপ বেড়ে বিপর্যয় ঘটে বলে প্রাথমিক বর্ণনায় উঠে এসেছে। তবে দুর্ঘটনার সুনির্দিষ্ট কারণ নির্ধারণে তদন্তের ফল গুরুত্বপূর্ণ।
এই ঘটনায় মৃতদের পরিবারপিছু একজনকে সরকারি চাকরি এবং ২৫ লক্ষ টাকা আর্থিক সাহায্যের কথা ঘোষণা করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। আহতদের ৫ লক্ষ টাকা করে দেওয়ার কথাও উল্লেখ রয়েছে।
চোরবাগান-কাণ্ডের পর পুজোর বাকি দিনগুলিতে নিরাপত্তা বজায় রাখা এখন বড় চ্যালেঞ্জ। ফোরাম ফর দুর্গোৎসবের ১০ দফা নির্দেশিকার কার্যকারিতা নির্ভর করবে পুজো কমিটিগুলির বাস্তবায়ন, প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় এবং দর্শনার্থীদের সহযোগিতার উপর। উৎসবের আনন্দ বজায় রাখতে ভিড় নিয়ন্ত্রণ ও জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়াই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।




