গোটা সপ্তাহের সমস্ত ক্লান্তি ঠিক রবিবারে এসে মুছে দেওয়া যায়। যেইদিন আরামে চিকেনে ডুবে যাওয়ার দিন সেইদিন জনা ১০০ লোক নিজের কাজ ছেড়ে রিষড়ার পরিত্যক্ত কারখানা জেকে স্টিলের মেইন গেটের সামনে জোড়ো হয়ে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে সকাল ৮.৩০ থেকে। গোটা জমায়েতের অনেকটা জুড়েই রয়েছে কম বয়সীরা। সবার মধ্যে কুশল বিনিময় চলছে। একটা বিষয় খুব ‘কমন’, সবাই খোঁজ নিচ্ছেন তিনি কখন এসে পৌঁছাবেন। পথ চলতি বেশ কিছু উৎসাহী মানুষও খোঁজ নিলেন। সামনে দেখলাম চায়ের দোকানে এক মধ্য বয়স্ক ভদ্রমহিলা চা দিতে দিতে জিজ্ঞাসা করলেন কটার সময় আসবেন।খানিকক্ষণ বাদে একটা গাড়ি এসে দাঁড়াল।
আরও পড়ুন: বসিরহাট কেন্দ্রে মাষ্টারস্ট্রোক বিজেপির, প্রার্থীতালিকায় সন্দেশখালির এক গৃহবধূ
গ্ল্যামার বর্জিত একজন মেয়ে ‘কে নামতে দেখে যারা চিনতে পারলেন না আশেপাশের চায়ের দোকানের কিছু মানুষ চমকে গেলেন! ইনিই ভোটের প্রার্থী? নাহ কোনো দামী গাড়ি নয়। না কোনো গ্ল্যামারের ঝলকানি নয়।মাটির কাছে দুটি পা আর মাটির সাথে দোস্তির কসম দীপ্সিতা হয়তো শিখেছে তার রাজনৈতিক অবস্থান থেকেই। শুরু হল পাড়া পরিক্রমা। এপাড়া,ওপাড়া মাঝেমধ্যেই থেমে মানুষজনের সাথে কুশল বিনিময় করে নেওয়া। অর্থাৎ যা রুটিন প্রচারের একটা অংশ। এরমধ্যে একটা জিনিস বেশ লক্ষনীয় বাচ্চা দেখলেই নিজের থেকে এগিয়ে গিয়ে আদুরে স্পর্শে তাকে আপন করে নিচ্ছেন। আসলে সবার ভেতরেই একটা শিশু বিরাজ করে। তাই শিশু দেখলেই পোড় খাওয়া রাজনীতিকেরও মুখের মধ্যে জেগে ওঠে মায়াবী হাসির রোল।
পদ্মনিধি ধরের নাতনি উচ্চশিক্ষিতা, কৃতী ছাত্রী। যেকোনো সময় তিনি বাকিদের মতো ভীড়ে মিশে যেতে পারতেন। মানে ঠিক যেইভাবে বাকিরা উচ্চশিক্ষার পরে সুনিশ্চিত একটা ভবিষ্যৎ গড়ে তোলে। দীপ্সিতার সাথে কথা বললে বোঝা যায় তিনি রাজনৈতিক অবস্থানে সুদৃঢ়। স্রোতের বিপরীতে যাওয়া একটা দলের শ্রীরামপুর লোকসভাতে ক্যান্ডিডেট। প্রতিপক্ষ কল্যাণ বন্দোপাধ্যায়ের মতো রাজনৈতিক হেভিওয়েট। যিনি নিজেও শপথ করেছেন বাউন্ডারি হাকানোর। লড়াই খুব কঠিন। জমি শক্ত।তবুও চোয়াল শক্ত করে মেয়েটা লড়াই করছে।এই কথা গুলোই বারবার কানে আসছিল।রবিবাসরীয় প্রচারের সকালবেলা চষে ফেললেন রিষড়ার রেলপার্ক,দাসপাড়া,সুভাষনগর, দক্ষিণপাড়া, বারুজীবী, সৌদামিনী নগর, নবীনপল্লী, পঞ্চাননতলা বাজার পর্যন্ত।তারপর দলীয় কার্যালয়ে গিয়ে একদম পাশের বাড়ির মেয়েটার মতো গানে মাতলেন,সেল্ফি তুললেন,চায়ে চুমুক দিতে দিতেই প্রায় অনেকের সাথেই সেরে নিলেন আলাপচারিতা।

দুপুর ১টার সময় লাঞ্চ করবার ঠিক আগেই নির্বিকার চিত্তে মেটালেন ইন্টারভিউয়ের আবদার। নির্বাচিত সাংসদ কল্যাণ বন্দোপাধ্যায় ঠিক কী কাজ এই শ্রীরামপুর লোকসভার জন্য সেই বিষয়ে বেশ সন্দিহান দীপ্সিতা নিজেও।এলাকার মানুষের একাংশের মতে লক্ষীর ভান্ডার, স্বাস্থ্যসাথীর প্রচার দেওয়াল জুড়ে।এলাকার দেওয়াল দেখলে যা খুব ভালো ভাবেই বোঝা যায়। কিন্তু এখানেই অনেকে প্রশ্ন করছেন লোকসভার ভোটে যেখানে তৃণমূল কংগ্রেস মিরাকেল করলেও ৪২ এর বেশী একটি আসন পাবে না। যা এই মুহুর্তের বিবেচনায় সরকার গড়বার ক্ষেত্রেও কাজে আসবে না। তারপরেও এই ঘোলাটে প্রচারের মানে কী? মানুষকে বিভ্রান্ত করা!প্রসঙ্গত তৃণমূলের জনপ্রতিনিধিরা মানুষকে একপ্রকার বলেই দিচ্ছেন তৃণমূল না জিতলে সেই এলাকার মানুষ পরিষেবা থেকে বঞ্চিত থাকবেন।যদি নির্বাচিত হন তাহলে সংসদে সংখার বিচারে সংখ্যালঘু হলেও তিনি তার বাগ্মিতা,যুক্তির জোড়ে শ্রীরামপুরের মানুষের অধিকার ছিনিয়ে আনবেন সেই কথাই জানালেন।আর এই বৃহৎ অংশের মানুষের কাছে বেশ সাবলীলভাবেই মিশে গেলেন সারাদিন ধরে।
ছাত্র রাজনীতি থেকে লোকসভার প্রার্থী, শ্রীরামপুরে প্রচার সারলেন দীপ্সিতা ধর

এরপরের গন্তব্য বিকেলের মহামিছিল। লাগোয়া শহরতলী কোন্নগরের রেলস্টেশনের পাশের আন্ডারপাস থেকে প্রায় ৬.৫ কিলোমিটার দীর্ঘ পথ।বিকেলের সেই মিছিলে উপচে পড়েছে ভীড়।মিছিলের শেষে উত্তরপাড়া কলেজের কাছে,ঠিক বালিখালের আগে সভা হলো। সেইখানেই বক্তব্য রাখলেন সিপিআইএমের তরুণ তুর্কী।এইতো সেইদিনের কথা যেদিন মেয়েটা দিল্লিতে সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটিতে ছাত্র রাজনীতি করছিলো। তারপর ২০২১-এ দলের ক্রাইসিস সময়ে যখন অনেকেই একে, একে ল্যাজ ঘুটিয়ে পালিয়ে গিয়েছিলো। হিম্মত দেখিয়ে সামনে থেকে লড়াই করেছে। আজ সেই দীপ্সিতা লোকসভার প্রার্থী। ভোটের রেজাল্ট আগের থেকে হিসাব করবার যে কারবার এখন চালু হয়েছে সেই বিষয়ে আমার অন্তত প্রবল আপত্তি রয়েছে।ভারতবর্ষে যে হাতে গোনা কয়েকজন সেফোলজিস্ট রয়েছেন তারা বাদ দিলে এখন যে নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে কাটাছেঁড়া হয় তা বড্ড হাস্যকর।এমনকি যেই সংখ্যার উপর সার্ভে করা হয় তা নিতান্তই সামান্য শতাংশের হিসাবে। দীপ্সিতা জিতবে কিনা সময় বলবে।প্রাক দোলের মেগা সানডে রিষড়া থেকে উত্তরপাড়া দীপ্সিতাময় হয়ে রইল।জয়ী বলব নাকি রবীন্দ্রনাথের কৃষ্ণকলি নাকি দীপ্সিতা সেই প্রশ্নে মায়াবী হাসি হেসে ধাঁধা রেখে দিলেন।ভোটের ডার্বিতে শেষ হাসি কে হাসবে সেই ধাঁধার জট খুলতে এখনো জুন মাস অব্দি অপেক্ষা।ততদিন মেয়েটা হেঁটে যাক মাইলের পর মাইল এই আশাতেই বুক বাধঁছেন তার কমরেড’রা।



