শ্রী চন্দ্র বিনোদ: আজ ২৫ জুলাই, শনিবার—পবিত্র দেবশয়নী একাদশী। হিন্দু ধর্মে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই তিথিতে ভগবান বিষ্ণু ক্ষীরসাগরে শেষনাগের শয্যায় চার মাসের জন্য যোগনিদ্রায় গমন করেছেন। এই দিন থেকেই শুরু হচ্ছে চতুর্মাস—শ্রাবণ, ভাদ্র, আশ্বিন ও কার্তিক মাসব্যাপী পবিত্র ব্রতকাল। দেবশয়নী একাদশীকে আষাঢ়ী একাদশী, হরিশয়নী একাদশী বা শয়নী একাদশী নামেও অভিহিত করা হয়। এই বিশেষ তিথিতে উপবাস, বিষ্ণুপুজো ও দান-পুণ্যের মাধ্যমে ভক্তরা জীবনে সুখ-সমৃদ্ধি ও মোক্ষলাভের পথ সুগম করেন।
📿 এক নজরে দেবশয়নী একাদশী ২০২৬
২৫ জুলাই ২০২৬, শনিবার
২৪ জুলাই, সকাল ০৯:১২
২৫ জুলাই, সকাল ১১:৩৪
২৬ জুলাই, ভোর ০৫:২৫ – ০৯:৫১
চতুর্মাসের সূচনা
ভগবান বিষ্ণু ও মা লক্ষ্মী
বিবাহ, গৃহপ্রবেশসহ মাঙ্গলিক কাজ
তুলসী, হলুদ ফুল, পঞ্চামৃত
“ওঁ নমো ভগবতে বাসুদেবায়”
মেষ, সিংহ, তুলা, ধনু
দেবশয়নী একাদশীর তাৎপর্য ও পৌরাণিক কাহিনী
রাজা মান্ধাতার কাহিনি: পৌরাণিক বিশ্বাস অনুসারে, সত্যযুগে সূর্যবংশের চক্রবর্তী সম্রাট মান্ধাতা অত্যন্ত ধার্মিক ও প্রজাবৎসল ছিলেন। কিন্তু একসময় তাঁর রাজ্যে তিন বছর ধরে বৃষ্টি না হওয়ায় প্রবল দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। প্রজাদের দুঃখে কাতর হয়ে রাজা বনে গিয়ে ঋষি অঙ্গিরার (Angira Rishi) কাছে উপদেশ প্রার্থনা করেন।
ঋষি অঙ্গিরা জানান, রাজ্যে এক শূদ্র তপস্যা করছেন, যা সত্যযুগের নিয়ম অনুযায়ী শাস্ত্রসম্মত নয়। কিন্তু নিরপরাধ ব্যক্তিকে হত্যায় রাজি না হয়ে রাজা অঙ্গিরার পরামর্শে দেবশয়নী একাদশীর ব্রত পালনের সিদ্ধান্ত নেন। রাজা নিজের পরিবার ও প্রজাদের নিয়ে সম্পূর্ণ ভক্তি ও নিষ্ঠার সঙ্গে এই ব্রত পালন করলে তাঁর রাজ্যে প্রবল বৃষ্টি হয় এবং রাজ্য পুনরায় শস্যশ্যামলা হয়ে ওঠে।
এই পৌরাণিক কাহিনি থেকে বোঝা যায়, দেবশয়নী একাদশীর ব্রত কেবল আধ্যাত্মিক নয়, বাস্তব জীবনের সমস্যা সমাধানেও সহায়ক বলে বিশ্বাস করা হয়।
দেবশয়নী একাদশীর গুরুত্ব ও চতুর্মাস
দেবশয়নী একাদশী কেবল একটি ব্রত নয়, এটি চতুর্মাসের সূচনা। হিন্দু বিশ্বাস অনুসারে, এই দিন ভগবান বিষ্ণু ক্ষীরসাগরে শেষনাগের শয্যায় যোগনিদ্রায় প্রবেশ করেন। চার মাস পর কার্তিক মাসের শুক্লপক্ষের দেবউত্থানী একাদশীতে তিনি নিদ্রা থেকে জেগে ওঠেন।
চার মাসের চতুর্মাসে (শ্রাবণ, ভাদ্র, আশ্বিন, কার্তিক) মাঙ্গলিক কাজ নিষিদ্ধ থাকে যেমন—বিবাহ, গৃহপ্রবেশ, উপনয়ন, মুণ্ডন। তবে এই সময় ভক্তরা জপ, ব্রত, দান, ধ্যান ও ধর্মীয় সাধনায় বিশেষ গুরুত্ব দেন। চতুর্মাসে নিষ্ঠার সঙ্গে বিষ্ণুর উপাসনা করলে জীবনে শুভ ফল, মানসিক শান্তি ও ঈশ্বরের বিশেষ কৃপা লাভ হয় বলে বিশ্বাস করা হয়।
পুজোর নিয়ম ও ব্রত পালনের পদ্ধতি
সঠিক নিয়মে ব্রত পালন করলে ভগবান বিষ্ণুর বিশেষ আশীর্বাদ পাওয়া যায়। জেনে নিন কীভাবে—
প্রাতঃ স্নান ও সংকল্প: একাদশীর দিন ব্রহ্মমুহূর্তে (ভোর ৪টার পর) উঠে পবিত্র জল বা গঙ্গাজলে স্নান করুন। হাতে অক্ষত নিয়ে বিষ্ণুপুজোর সংকল্প গ্রহণ করুন।
পুজোর আয়োজন: একটি চৌকিতে হলুদ কাপড় বিছিয়ে ভগবান বিষ্ণু বা তাঁর কৃষ্ণের মূর্তি বা ছবি স্থাপন করুন। বিষ্ণু হলুদ বস্তুতে বিশেষ প্রীত হন, তাই হলুদ ফুল, ফল, চন্দন অর্পণ করুন। তুলসী পাতা বিষ্ণুপুজোতে অপরিহার্য।
মন্ত্র জপ ও আরতি: “ওঁ নমো ভগবতে বাসুদেবায়” মন্ত্র, বিষ্ণু সহস্রনাম বা অন্যান্য বিষ্ণুমন্ত্র জপ করুন। নিয়ম অনুযায়ী সন্ধ্যাবেলায় পুনরায় পুজো করে ভগবানকে সুসজ্জিত বিছানায় শুইয়ে দিন।
ব্রত ও পারণ: একাদশীর দিন পূর্ণ উপবাস বা ফলাহার (ফলমূল ও দুধজাত খাবার) পালন করা হয়। এক্ষেত্রে চাল বা অন্ন গ্রহণ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। পরদিন ২৬ জুলাই, ভোর ০৫:২৫ থেকে ০৯:৫১-এর মধ্যে পারণ (উপবাস ভাঙা) করতে হয়।
দান-পুণ্য: অভাবী মানুষকে সাধ্যমত হলুদ কাপড়, ফল, শস্য, ঘি, গুড় দান করুন। বিশ্বাস করা হয়, এই দিন দান-পুণ্য করলে সমস্ত পাপ থেকে মুক্তি পাওয়া যায়।
বিশেষ মন্ত্র ও প্রার্থনা
দেবশয়নী একাদশীতে এই ৫টি বিষ্ণুমন্ত্র জপ করলে শ্রীহরির বিশেষ আশীর্বাদ পাওয়া যায়—
১. “ওঁ নমো নারায়ণায়ঃ”
২. “ওঁ নমো ভগবতে বাসুদেবায়”
৩. “ওঁ শ্রী বিষ্ণবে চ বিদ্মহে বাসুদেবায় ধীমহি। তন্নো বিষ্ণুঃ প্রচোদয়াত্”
৪. “শান্তাকারং ভুজগশয়নং পদ্মনাভং সুরেশং। বন্দে বিষ্ণুং ভবভয়হরং সর্বলোকৈকনাথম্”
৫. “মঙ্গলং ভগবান বিষ্ণুঃ, মঙ্গলং গরুড়ধ্বজঃ। মঙ্গলং পুণ্ডরীকাক্ষঃ, মঙ্গলায় তনো হরিঃ”
এই রাশির জাতক-জাতিকারা পাবেন বিশেষ আশীর্বাদ
জ্যোতিষশাস্ত্র মতে, দেবশয়নী একাদশী থেকে শুরু হওয়া চতুর্মাসে মেষ, সিংহ, তুলা এবং ধনু রাশির জাতক-জাতিকাদের জন্য বিশেষ ইতিবাচক পরিবর্তনের সম্ভাবনা রয়েছে।
মেষ রাশি (Aries): চাকরিজীবীরা পদোন্নতি বা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পাওয়ার সুযোগ পেতে পারেন। ব্যবসায়ীরা নতুন চুক্তি ও ভালো মুনাফার সম্ভাবনা দেখতে পাবেন। আটকে থাকা অর্থ ফেরত আসতে পারে।
সিংহ রাশি (Leo): কর্মজীবনে উল্লেখযোগ্য উন্নতির সম্ভাবনা রয়েছে। চাকরি পরিবর্তনের পরিকল্পনা থাকলে সময়টি বিশেষ অনুকূল। বিনিয়োগে ভালো ফল মিলতে পারে।
তুলা রাশি (Libra): জমি, বাড়ি বা গাড়ি কেনার পরিকল্পনা সফল হতে পারে। জীবনসঙ্গীর সঙ্গে সম্পর্ক আরও দৃঢ় হবে। স্বাস্থ্যেরও উন্নতি হবে।
ধনু রাশি (Sagittarius): দীর্ঘদিন আটকে থাকা কাজ সম্পন্ন হবে। আয়ের নতুন উৎস তৈরি হতে পারে। ব্যবসায়ীরা লাভজনক চুক্তির সম্ভাবনা পাবেন।
দেবশয়নী একাদশীতে করণীয় ও বর্জনীয়
✅ করণীয়:
-
ব্রহ্মমুহূর্তে উঠে স্নান করুন
-
বিষ্ণুকে হলুদ ফুল, তুলসী, পঞ্চামৃত অর্পণ করুন
-
“ওঁ নমো ভগবতে বাসুদেবায়” মন্ত্র জপ করুন
-
বিষ্ণু সহস্রনাম বা ব্রতকথা পাঠ করুন
-
অভাবী মানুষকে দান করুন
-
রাত্রি জাগরণ করে কীর্তন-ভজন করুন
❌ বর্জনীয়:
-
চাল বা অন্ন গ্রহণ করবেন না
-
বিবাহ, গৃহপ্রবেশসহ কোনো মাঙ্গলিক কাজ করবেন না
-
কারও সঙ্গে কটু কথা বা অসদাচরণ করবেন না
-
মিথ্যা বলা, প্রতারণা ও সহিংসতা বর্জন করুন
শেষকথা:
দেবশয়নী একাদশী মানব জীবনে সংযম, ভক্তি ও আধ্যাত্মিক চেতনার উন্মেষ ঘটায়। এই পবিত্র তিথি শুধু ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি আত্মশুদ্ধি ও ঈশ্বরের প্রতি অটল বিশ্বাসের প্রতীক। নিষ্ঠা ও ভক্তি সহকারে এই ব্রত পালন করলে জীবনে সুখ-সমৃদ্ধি আসে এবং অন্তিমে মোক্ষলাভের পথ সুগম হয়।



