জুলাইয়ের বিক্ষোভে ২৮৭৩ জনের বিরুদ্ধে নতুন FIR, হিংসায় কার ভূমিকা ছিল খতিয়ে দেখবে দিল্লি পুলিশ

সুপ্রিম কোর্ট সাধারণ প্রতিবাদকারীদের বিরুদ্ধে FIR খারিজ করার পর ২৮৭৩ জনকে নিয়ে নতুন তদন্তে দিল্লি পুলিশ। জুলাইয়ের হিংসায় তাঁদের ভূমিকা ছিল কি না, খতিয়ে দেখবে ক্রাইম ব্রাঞ্চ।

নজরবন্দি ডিজিটাল ডেস্ক

জুলাইয়ের ‘চলো সংসদ’ (Chalo Sansad) মিছিল ঘিরে হিংসার ঘটনায় ২৮৭৩ জনকে নিয়ে নতুন করে FIR দায়ের করল দিল্লি পুলিশ। ক্রাইম ব্রাঞ্চ (Crime Branch) এই তদন্তে খতিয়ে দেখবে, তালিকায় থাকা ব্যক্তিরা আদৌ ২০ জুলাইয়ের বিক্ষোভে উপস্থিত ছিলেন কি না, তাঁদের বিরুদ্ধে আগের কোনও গুরুতর অপরাধের রেকর্ড রয়েছে কি না এবং ওই দিনের সংঘর্ষে তাঁদের নির্দিষ্ট ভূমিকা ছিল কি না। সুপ্রিম কোর্টের (Supreme Court) নির্দেশের পরেই এই নতুন তদন্ত শুরু হয়েছে।

২০ জুলাই জন্তর মন্তর (Jantar Mantar) থেকে সংসদের দিকে এগিয়েছিল ককক্রোচ জনতা পার্টি বা CJP-র ডাকা মিছিল। পথে একাধিক জায়গায় পুলিশ ও বিক্ষোভকারীদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। বেশ কয়েক জন প্রতিবাদকারী আহত হন। দিল্লি পুলিশের দাবি, সংঘর্ষে প্রায় ২০০ জন পুলিশকর্মী, তাঁদের মধ্যে কয়েক জন পদস্থ আধিকারিকও, আহত হয়েছিলেন। ওই ঘটনার তদন্ত পরে ক্রাইম ব্রাঞ্চ এবং স্পেশাল সেলের (Special Cell) হাতে যায়।

এর আগে জুলাইয়ের ওই আন্দোলন ঘিরে একাধিক FIR দায়ের হয়েছিল। সেই মামলাগুলির মধ্যে যেগুলিতে সাধারণ প্রতিবাদকারীদের বিরুদ্ধে শুধু বিক্ষোভে অংশ নেওয়ার অভিযোগ ছিল, সেগুলি নিয়ে সুপ্রিম কোর্টে মামলা হয়। ১ সেপ্টেম্বর শীর্ষ আদালত ২০ থেকে ২৫ জুলাইয়ের আন্দোলন সংক্রান্ত একাধিক FIR খারিজ করে দেয় এবং স্পষ্ট করে যে শুধুমাত্র প্রতিবাদে অংশ নেওয়াকে অপরাধ হিসেবে দেখা যাবে না।

তবে একই নির্দেশে একটি নির্দিষ্ট ব্যতিক্রমও রাখা হয়েছিল। পুলিশের চিহ্নিত ২৮৭৩ জনের ক্ষেত্রে, যাঁদের বিরুদ্ধে গুরুতর অপরাধের পূর্ব-রেকর্ড থাকার দাবি করা হয়েছিল, তাঁদের ভূমিকা আলাদা করে তদন্ত করার সুযোগ দেয় আদালত। এই তদন্তের উদ্দেশ্য শুধু অতীতের মামলা খতিয়ে দেখা নয়; জুলাইয়ের বিক্ষোভে ওই ব্যক্তিরা কী করেছিলেন, হিংসায় তাঁদের কোনও প্রত্যক্ষ ভূমিকা ছিল কি না, সেটিও যাচাই করার কথা।

দিল্লি পুলিশের নতুন FIR-এ তাই ২৮৭৩ জনকে জুলাইয়ের হিংসায় অভিযুক্ত হিসেবে চূড়ান্ত ভাবে ঘোষণা করা হয়নি। বরং তাঁদের বিরুদ্ধে থাকা পুরনো অপরাধের রেকর্ড, বিক্ষোভস্থলে তাঁদের উপস্থিতি এবং ঘটনার সঙ্গে তাঁদের সম্ভাব্য যোগসূত্র খতিয়ে দেখা হবে। পুলিশের তদন্তে আরও দেখা হবে, তাঁদের কেউ আন্দোলনে যুক্ত ছাত্র সংগঠনগুলির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন কি না এবং সংঘর্ষের সময় জনতাকে নেতৃত্ব দেওয়া বা উসকানি দেওয়ার কোনও ভূমিকা নিয়েছিলেন কি না।

এই তালিকা তৈরির ক্ষেত্রে দিল্লি পুলিশের Facial Recognition System বা FRS-ও ব্যবহার করা হয়েছিল। পুলিশের দাবি অনুযায়ী, বিক্ষোভের ছবি ও ফুটেজ বিশ্লেষণ করে ২৮৭৩ জনকে এমন ব্যক্তি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল, যাঁদের বিরুদ্ধে অপরাধের রেকর্ড রয়েছে। পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, তাঁদের মধ্যে ৯৮৯ জনের বিরুদ্ধে গুরুতর বা ‘heinous’ অপরাধের মামলা রয়েছে, ১০১ জন খুনের মামলায় অভিযুক্ত এবং অন্তত ৪২ জনের বিরুদ্ধে দু’টি বা তার বেশি খুনের মামলা রয়েছে।

তবে মুখ শনাক্তকরণ প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়েও ইতিমধ্যে প্রশ্ন উঠেছে। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের আগের এক অনুসন্ধানে ২৮৭৩ জনের তালিকার অন্তত ২৫ জনকে নিয়ে অসঙ্গতির কথা সামনে এসেছিল। ওই ব্যক্তিদের মধ্যে গুরুতর অপরাধে অভিযুক্ত কয়েক জন সংশ্লিষ্ট সময় জেলে থাকার কথা ছিল, অথচ পুলিশের Facial Recognition System তাঁদের বিক্ষোভস্থলে শনাক্ত করেছে বলে দাবি করা হয়েছিল। ফলে প্রযুক্তিগত শনাক্তকরণকে চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করার আগে পৃথক ভাবে যাচাইয়ের প্রয়োজনীয়তা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

দিল্লি পুলিশের তরফে অবশ্য আগেই বলা হয়েছিল, Facial Recognition System-এ কোনও ব্যক্তির নাম উঠে আসাই তাঁর বিরুদ্ধে সরাসরি আইনি পদক্ষেপের শেষ কথা নয়। মাঠপর্যায়ে যাচাই করে দেখা হবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি সত্যিই বিক্ষোভস্থলে ছিলেন কি না। সেই যাচাইয়ের পরই জুলাইয়ের ঘটনার সঙ্গে তাঁর কোনও অপরাধমূলক যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা নির্ধারণ করার কথা।

এ দিকে ১০ অক্টোবর ফের দিল্লিতে বিক্ষোভের ডাক দিয়েছে CJP। ‘জন্তর মন্তর ২.০’ নামে প্রস্তাবিত ওই কর্মসূচিতে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবি তোলা হয়েছে। দিল্লি পুলিশের দাবি, এখনও ওই কর্মসূচির অনুমতি দেওয়া হয়নি। তার আগেই জুলাইয়ের বিক্ষোভে চিহ্নিত ব্যক্তিদের নিয়ে স্থানীয় থানাগুলিকে সতর্ক রাখা হয়েছে বলে পুলিশ সূত্রে খবর।

পুলিশ সূত্রের বক্তব্য, জুলাইয়ের বিক্ষোভে যাঁদের গুরুতর অপরাধের পূর্ব-রেকর্ড রয়েছে বলে চিহ্নিত করা হয়েছিল, তাঁদের মধ্যে কেউ ১০ অক্টোবরের কর্মসূচিতে ফের দিল্লিতে আসছেন কি না, স্থানীয় স্তরে তা নজরে রাখা হবে। পুলিশের যুক্তি, উদ্দেশ্য হল আইনশৃঙ্খলার সমস্যা তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা ঠেকানো। তবে শুধুমাত্র পূর্বের অপরাধের মামলা থাকা মানেই ১০ অক্টোবরের কর্মসূচিতে ওই ব্যক্তিরা কোনও অপরাধ করবেন—এমন কোনও সিদ্ধান্ত এখনও হয়নি।

ফলে জুলাইয়ের ‘চলো সংসদ’ মিছিল নিয়ে তৈরি হওয়া আইনি পরিস্থিতি এখন দুই ভাগে দাঁড়িয়েছে। সাধারণ প্রতিবাদকারীদের বিরুদ্ধে শুধুমাত্র আন্দোলনে অংশ নেওয়ার কারণে দায়ের হওয়া মামলাগুলিতে সুপ্রিম কোর্ট হস্তক্ষেপ করেছে। অন্য দিকে, ২৮৭৩ জনের ক্ষেত্রে আদালত নির্দিষ্ট তদন্তের পথ খোলা রেখেছে। নতুন FIR-এর মাধ্যমে দিল্লি পুলিশ এখন সেই তালিকায় থাকা ব্যক্তিদের অতীতের রেকর্ডের সঙ্গে ২০ জুলাইয়ের ঘটনাস্থলে তাঁদের উপস্থিতি এবং সম্ভাব্য ভূমিকার যোগসূত্র খুঁজবে।

এই তদন্তের ফলেই শেষ পর্যন্ত স্পষ্ট হবে, ২৮৭৩ জনের তালিকায় থাকা কত জন সত্যিই ওই দিনের বিক্ষোভে ছিলেন এবং তাঁদের মধ্যে কারও বিরুদ্ধে জুলাইয়ের হিংসা, শারীরিক আঘাত বা সরকারি সম্পত্তি নষ্ট করার মতো নির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তি রয়েছে কি না। আপাতত নতুন FIR তদন্তের সূচনা—চূড়ান্ত অপরাধ প্রমাণের সিদ্ধান্ত নয়।

সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে

Google News Google News এবং Google Discover Google Discover -এ নজরবন্দি-কে Follow করে রাখুন।

আরও পড়ুন