আলিমুদ্দিন স্ট্রিটে এখন সিনেমার মতো টানটান উত্তেজনা। একদিকে অপর্ণা সেনের মতো ক্লাসিক দর্শন, অন্যদিকে হরনাথ চক্রবর্তীর গণভিত্তিক কৌশল। প্রশ্ন একটাই—২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে কোন পথ বেছে নেবে সিপিএম? দল বাঁচানোর ‘স্ক্রিপ্ট’ লিখবেন কে—অপর্ণা না হরনাথ?
সিপিএমের অন্দরেই এখন তীব্র বিতর্ক। এক গোষ্ঠীর মতে, সময় এসেছে ‘ফোকাসড’ লড়াইয়ে নামার—অর্থাৎ কিছু নির্দিষ্ট আসনে জোর দিয়ে অন্তত খাতা খোলা। তাঁদের মতে, এটি অপর্ণা সেনের সিনেমার মতোই, যেখানে গভীর চিন্তা, সীমিত দর্শক, কিন্তু প্রভাবশালী বার্তা। অপরপক্ষের দাবি, এভাবে নির্বাচনে নামলে বিজেপি ঘাড়ে চেপে বসবে। তাই দরকার ‘হরনাথ মডেল’—গণভিত্তিক, সর্বত্র উপস্থিতি এবং প্রতিটি কেন্দ্রে সক্রিয় লড়াই।
প্রথম গোষ্ঠী মনে করছে, সিপিএমের বর্তমান সাংগঠনিক শক্তি দিয়ে সব জায়গায় লড়া সম্ভব নয়। তাই নির্দিষ্ট কিছু জেলায় জোর দেওয়া উচিত—যেমন উত্তর দিনাজপুর, মুর্শিদাবাদ, মালদহ, নদিয়া বা হুগলির কয়েকটি কেন্দ্র। তাঁদের মতে, এভাবে দল অন্তত ‘শূন্যগ্রহণ’ থেকে বেরোতে পারবে।
অন্যদিকে, ‘হরনাথপন্থী’ নেতারা বলছেন, সীমিত আসনে লড়লে সিপিএমের ভোট শতাংশ আরও কমে যাবে। তাঁদের যুক্তি, গত লোকসভা ভোটেই দেখা গিয়েছে, অনেক আসনে বামেদের ভোটেই বিজেপি আটকানো সম্ভব হয়েছে। ফলে এবারও সর্বত্র লড়াই জরুরি।
এই দ্বন্দ্বকে কেন্দ্র করে বিজেপি ও তৃণমূল দুই শিবিরই রাজনৈতিক বারুদ ছড়াচ্ছে। বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারী সম্প্রতি বলেছেন, “দমদমে সুজন চক্রবর্তী ও ব্যারাকপুরে দেবদূত ঘোষ না থাকলে বিজেপি দু’টি আসনেই জিতত।” তাঁর অভিযোগ, সিপিএম তৃণমূলের অজান্তে ‘উপকার’ করছে। রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্যও বলেছেন, “বুকে পাথর চেপে হলেও এ বার পদ্মফুলে ভোট দিন।”
অন্যদিকে তৃণমূল কংগ্রেসের মুখপাত্র অরূপ চক্রবর্তী ব্যঙ্গ করে বলেছেন, “সিপিএম এখন কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়ের ছবির মতো—‘খাদের কিনারায়’। যতই অপর্ণা বা হরনাথ নিয়ে আলোচনা হোক, ভোটের পরে শেষ দৃশ্য সেই একটাই—শূন্য।”
তবে মুখে কিছু না বললেও, সিপিএমের কেন্দ্রীয় নেতা সুজন চক্রবর্তী জানাচ্ছেন, “বামেরা ছাড়া রসাতলে যাওয়া বাংলাকে কেউ বাঁচাতে পারবে না।” তাঁর এই বক্তব্যে দলের ‘অপর্ণা বনাম হরনাথ’ দ্বন্দ্ব যেন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। কারণ, একদল চাইছে ভাবনাপূর্ণ, নির্বাচিত লড়াই; আরেকদল চাইছে সর্বাত্মক যুদ্ধ।
নভেম্বর থেকেই সিপিএম আবার নামছে রাজ্যজুড়ে পদযাত্রায়, উত্তরবঙ্গ থেকে দক্ষিণবঙ্গ পর্যন্ত। ২০২৪ সালের লোকসভা ভোটের আগেও এমন যাত্রা হয়েছিল। কিন্তু সেই ভিড় ভোটে প্রতিফলিত হয়নি। এবার তাই নতুন স্ট্র্যাটেজি—কোন দর্শন দলকে বাঁচাবে, সেটিই এখন আলিমুদ্দিনের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
শেষ পর্যন্ত সিপিএম কি অপর্ণা সেনের ‘৩৬ চৌরঙ্গী লেন’-এর মতো সীমিত অথচ গম্ভীর দর্শন বেছে নেবে, নাকি হরনাথ চক্রবর্তীর ‘শ্বশুরবাড়ি জিন্দাবাদ’-এর মতো গণমুখী পথ—তা সময়ই বলবে। কিন্তু একথা স্পষ্ট, দল বাঁচাতে হলে আগে ‘শূন্যগ্রহণ’ ভাঙতেই হবে।







