কাঁধে ঝোলাভর্তি বই। পাড়ায় পাড়ায়, বাড়ির দরজায় হাজির হবেন কমরেডরা। উদ্দেশ্য শুধু বই বিক্রি নয়, পাশাপাশি মানুষের সঙ্গে নিবিড় জনসংযোগও। ঠিক যেন জীবনানন্দ দাশের কবিতার ‘রানার’-এর মতো বইয়ের ঝোলা কাঁধে নিয়ে পথে নামতে চলেছেন সিপিএম কর্মীরা। আগামী ১৫ নভেম্বর থেকে রাজ্যজুড়ে ‘বাড়ি বাড়ি বুকস্টল’ কর্মসূচি শুরু করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে আলিমুদ্দিন স্ট্রিট।
নভেম্বর বিপ্লব বার্ষিকীকে সামনে রেখেই এই অভিনব উদ্যোগ সিপিএমের। দলের তরফে মোট ৩৭ ধরনের বই ও বুকলেটের তালিকা তৈরি করা হয়েছে। সেগুলি নিয়ে বাড়ি বাড়ি যাবেন কর্মীরা। সাধারণ মানুষের কাছে বই পৌঁছে দেওয়ার পাশাপাশি রাজনৈতিক ও সামাজিক বিষয় নিয়ে আলোচনার সুযোগও তৈরি করতে চাইছে দল। তালিকায় যেমন থাকছে বিবেকানন্দ, শ্রীচৈতন্য, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ও সুকান্ত ভট্টাচার্যের লেখা, তেমনই রয়েছে বামপন্থী নেতৃত্বের বিভিন্ন বই ও পুস্তিকা।
৩৭ ধরনের বই নিয়ে বাড়ি বাড়ি অভিযান
সিপিএম সূত্রে খবর, চিহ্নিত ৩৭টি বইয়ের মধ্যে ১০টি বুকলেট একেবারে নতুন। অল্প দামে সাধারণ মানুষের হাতে সেগুলি পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। বইয়ের তালিকায় থাকছে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসুর পুরনো লেখা ‘আমরা কী চাই’। পাশাপাশি রয়েছে দলের সাধারণ সম্পাদক এম এ বেবির লেখা ‘জাতিবাদের নতুন চেহারা’।
এ ছাড়াও থাকছে ‘গণতন্ত্র ধ্বংসের অভিযানে বিজেপি’ এবং ‘ভোট চুরির কীর্তিকলাপ’ নামে পুস্তিকা। হরকিষেণ সিং সুরজিৎ, সীতারাম ইয়েচুরি এবং মহম্মদ সেলিমের মতো দলের নেতৃত্বের লেখাও রাখা হয়েছে এই তালিকায়।
সিপিএমের লক্ষ্য, বইকে কেন্দ্র করে মানুষের সঙ্গে নতুন করে যোগাযোগ গড়ে তোলা। বিশেষ করে বাড়ি বাড়ি গিয়ে বই বিক্রির মাধ্যমে সাধারণ মানুষের কাছে দলের বক্তব্য ও রাজনৈতিক অবস্থান পৌঁছে দিতে চাইছে নেতৃত্ব।
বইয়ের সংস্কৃতি নিয়ে সরব মহম্মদ সেলিম
এই কর্মসূচির তাৎপর্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক তথা পলিটব্যুরো সদস্য মহম্মদ সেলিম বই পড়া ও লেখার সংস্কৃতির উপর জোর দিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, দেশ গড়তে হলে বই পড়তে হয়। যাঁরা দেশ গড়েন, তাঁরা বই লেখেন, বই ছাপেন এবং মত বিনিময় করেন। অন্যদিকে, যাঁরা দেশ ভাঙেন, তাঁদের কাছে বুলডোজার বা অ্যাটম বোমাই যথেষ্ট।
ভিয়েতনামের স্বাধীনতা সংগ্রামের উদাহরণ টেনেও বইয়ের গুরুত্ব ব্যাখ্যা করেছেন সেলিম। তাঁর কথায়, হো চি মিনের নেতৃত্বে ভিয়েতনামে যাঁরা স্বাধীনতার লড়াই করছিলেন, তাঁরা সারা বিশ্বের ইতিহাস লিখছিলেন। আর যাঁরা কার্পেট বম্বিং করছিলেন, তাঁরা ধ্বংস চালাচ্ছিলেন। সেলিমের বক্তব্য, বইয়ের সংস্কৃতি আসলে গড়ার সংস্কৃতি এবং সৃজনশীলতার সংস্কৃতি।
বুকস্টল ভাঙার অভিযোগ তুলে বিজেপিকে নিশানা সুজনের
এই কর্মসূচি নিয়ে বিজেপিকে আক্রমণ করেছেন সিপিএমের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য তথা প্রাক্তন বিধায়ক সুজন চক্রবর্তী। তাঁর অভিযোগ, রাজ্যের শাসকদল বিজেপি প্রতিবাদ ও মানুষের মতপ্রকাশকে ভয় পাচ্ছে। বইকেও ভয় পাচ্ছে তারা। বুকস্টল ভাঙার চেষ্টা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেছেন তিনি।
সুজনের বক্তব্য, শাসকদল ভেবেছিল তাদের চোখরাঙানিতে মানুষ ভয় পাবে। কিন্তু শারদোৎসবের সময় মানুষের উপস্থিতি এবং প্রতিবাদ সেই ধারণা ভুল প্রমাণ করেছে। ৩১ অক্টোবর কলকাতার মিছিলেও তার প্রতিফলন দেখা গিয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
তাঁর বক্তব্য, সেই পরিস্থিতিতেই আগামী ১৫ নভেম্বর ‘বাড়ি বাড়ি বুকস্টল’ কর্মসূচির ডাক দেওয়া হয়েছে। বইকে হাতিয়ার করে মানুষের কাছে পৌঁছনোর পাশাপাশি রাজনৈতিক সচেতনতা বাড়ানোর চেষ্টা করবে দল।
রাজনৈতিক প্রচারে নতুন কৌশল সিপিএমের?
রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, বাড়ি বাড়ি বই বিক্রির এই উদ্যোগ সিপিএমের জনসংযোগ বাড়ানোর একটি নতুন কৌশল হতে পারে। দীর্ঘদিন ধরে সংগঠন ও জনভিত্তি মজবুত করার চ্যালেঞ্জের মুখে থাকা বাম দলটি বইকে সামনে রেখে সাধারণ মানুষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের চেষ্টা করছে।
শুধু সভা, মিছিল বা পথসভার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে মানুষের বাড়ির দরজায় পৌঁছনোর পরিকল্পনা নিয়েছে দল। বইয়ের মাধ্যমে রাজনৈতিক মতাদর্শ, ইতিহাস, সাহিত্য ও সামাজিক ভাবনা তুলে ধরাই এই উদ্যোগের অন্যতম উদ্দেশ্য। এখন দেখার, ১৫ নভেম্বর থেকে শুরু হওয়া এই ‘বাড়ি বাড়ি বুকস্টল’ কর্মসূচি সাধারণ মানুষের মধ্যে কতটা সাড়া ফেলে এবং সিপিএমের জনসংযোগে কতটা প্রভাব ফেলে।



