শিক্ষা নিয়ে কেন্দ্র–রাজ্য সংঘাত তুঙ্গে! ধর্মেন্দ্রর তোপ, পাল্টা পয়েন্ট ধরে ধরে কড়া জবাব ব্রাত্যের

মিড ডে মিল, জাতীয় শিক্ষানীতি, সমগ্র শিক্ষা মিশনের অর্থ ও ইন্টারনেট পরিষেবা নিয়ে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের তোপ, পাল্টা জবাব রাজ্যের শিক্ষামন্ত্রী ব্রাত্য বসুর।

নজরবন্দি ডিজিটাল ডেস্ক

পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষাব্যবস্থা ঘিরে সরাসরি সংঘাতে জড়াল কেন্দ্র ও রাজ্য। কলকাতায় শিক্ষক সম্মেলনের মঞ্চ থেকে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান একের পর এক অভিযোগ তুললেন—মিড ডে মিলের টাকা অপব্যবহার, জাতীয় শিক্ষানীতি কার্যকর না করা, সমগ্র শিক্ষা মিশনের অর্থ আটকে থাকা, স্কুলে ইন্টারনেট ঘাটতি থেকে শিক্ষক সঙ্কট পর্যন্ত। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই রাজ্যের শিক্ষামন্ত্রী ব্রাত্য বসু সমাজমাধ্যমে ধরে ধরে জবাব দিয়ে অভিযোগগুলিকে ‘ভিত্তিহীন’ ও ‘রাজনৈতিক’ বলে আখ্যা দিলেন।

শনিবার কলকাতায় বিজেপির ডাকা শিক্ষক সম্মেলনে প্রধান বক্তা ছিলেন ধর্মেন্দ্র। মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীও। সেখান থেকেই কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর অভিযোগ, মিড ডে মিলের জন্য কেন্দ্র যে অর্থ পাঠায়, তা দলীয় কাজে ব্যবহার হচ্ছে। তাঁর দাবি, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বাংলার শিশুদের জন্য হাজার হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ করেছেন, কিন্তু সেই অর্থের সদ্ব্যবহার হচ্ছে না।

পাল্টা ব্রাত্য বসুর বক্তব্য, এ ধরনের অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। তিনি বলেন, যদি কোথাও অনিয়মের প্রমাণ থাকে, তবে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। সরকারের নজরে এমন কোনও অভিযোগ আসেনি।

জাতীয় শিক্ষানীতি নিয়ে টানাপোড়েন

ধর্মেন্দ্রর অভিযোগ, ২০২০ সালে চালু হওয়া জাতীয় শিক্ষানীতি পশ্চিমবঙ্গ কার্যকর করছে না। তাঁর মতে, মাতৃভাষায় শিক্ষার উপর জোর দেওয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রাজ্য মানছে না। স্বামী বিবেকানন্দ, ঋষি অরবিন্দ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, শিক্ষার মূল ভিত্তি মাতৃভাষা হওয়া উচিত।

ব্রাত্যের পাল্টা যুক্তি, ২০২৩ সালেই রাজ্য নিজস্ব শিক্ষানীতি গ্রহণ করেছে। জাতীয় শিক্ষানীতি থেকে গ্রহণযোগ্য বিষয়গুলি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি শিক্ষা যৌথ তালিকাভুক্ত বিষয়—তাই রাজ্যের নিজস্ব নীতি প্রণয়নের সাংবিধানিক অধিকার রয়েছে। মাতৃভাষায় শিক্ষার ক্ষেত্রে বাংলার পাশাপাশি সাঁওতালি, রাজবংশী, কামতাপুরী, উর্দু, হিন্দি ও নেপালি ভাষায় শিক্ষার ব্যবস্থার কথাও তুলে ধরেন তিনি।

সমগ্র শিক্ষা মিশনের টাকা নিয়ে বিতর্ক

ধর্মেন্দ্র দাবি করেন, জাতীয় শিক্ষানীতি কার্যকর করলে সমগ্র শিক্ষা মিশনে পশ্চিমবঙ্গ আরও ১০ হাজার কোটি টাকা পেতে পারত। তাঁর অভিযোগ, রাজ্য সেই সুযোগ হাতছাড়া করেছে।

ব্রাত্য পাল্টা জানান, রাজ্য সব শর্ত পূরণ করেছে এবং একাধিকবার কেন্দ্রকে চিঠি দিয়ে তা জানিয়েছে। কখনও শর্তসাপেক্ষ অর্থের কথা আনুষ্ঠানিক ভাবে জানানো হয়নি বলেও দাবি করেন তিনি। এই ধরনের শর্ত আরোপকে তিনি অনৈতিক বলে অভিহিত করেন।

ইন্টারনেট, শিক্ষক সঙ্কট ও এআই প্রসঙ্গ

স্কুলে ইন্টারনেট পরিষেবার ক্ষেত্রে ধর্মেন্দ্র বলেন, দেশে যেখানে ৭০ শতাংশ স্কুলে ইন্টারনেট রয়েছে, সেখানে পশ্চিমবঙ্গে তা মাত্র ১৬ শতাংশ। ব্রাত্য এই তথ্য উড়িয়ে দিয়ে জানান, বর্তমানে রাজ্যের ৬৬ শতাংশ স্কুলে ইন্টারনেট পরিষেবা চালু রয়েছে এবং দ্রুত বাকি স্কুলেও তা পৌঁছে যাবে।

শিক্ষক সঙ্কটের অভিযোগেও কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর বক্তব্যকে তথ্যভিত্তিক নয় বলে দাবি করেন ব্রাত্য। তাঁর মতে, কিছু বেসরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত স্কুল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পোর্টালে ভুল তথ্য থেকে গিয়েছে। সেগুলি সংশোধনের কাজ চলছে।

কৃত্রিম মেধা বা এআই চালুর ক্ষেত্রে রাজ্য পিছিয়ে রয়েছে—এই অভিযোগও তুলেছিলেন ধর্মেন্দ্র। পাল্টা ব্রাত্য জানান, ডেটা সায়েন্স ও এআই-কে স্কুল পাঠক্রমে যুক্ত করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। কারিগরি শিক্ষার উন্নয়নেও রাজ্য সক্রিয় বলেই দাবি তাঁর।

শিক্ষা ইস্যুতে এই প্রকাশ্য বাকযুদ্ধ যে রাজনৈতিক তাৎপর্য বহন করছে, তা স্পষ্ট। জাতীয় শিক্ষানীতি, কেন্দ্রীয় অনুদান এবং প্রশাসনিক ক্ষমতার প্রশ্নে কেন্দ্র–রাজ্য টানাপোড়েন আগামী দিনে আরও তীব্র হতে পারে বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা।

সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে

Google News Google News এবং Google Discover Google Discover -এ নজরবন্দি-কে Follow করে রাখুন।

আরও পড়ুন