দুর্গত কলকাতার রাস্তায় অদৃশ্য বিজেপি, দুর্যোগে ‘নিষ্ক্রিয়’ বিরোধী শিবিরের আম্ফালন শুধু সোশ্যাল মিডয়ায়

তৃণমূল সমালোচনায় বিদ্ধ হলেও রাজ্যের প্রধান বিরোধী বিজেপিকে দেখা গেল না দুর্গত কলকাতার রাস্তায়, সীমাবদ্ধ রইল সাংবাদিক বৈঠক আর সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টে।

নজরবন্দি ডিজিটাল ডেস্ক

পুজোর মুখে কলকাতায় আকাশভাঙা বৃষ্টি নামতেই শহরজুড়ে তৈরি হয়েছে ভয়াবহ বিপর্যয়। জলমগ্ন মহানগরে প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ১০ জন। সরকারি ব্যর্থতা নিয়ে সমালোচনা তুঙ্গে, তৃণমূল নেতৃত্বকে কাঠগড়ায় তুলছেন বিরোধীরা। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, এমন সংকটকালেও রাজ্যের প্রধান বিরোধী শক্তি বিজেপিকে কার্যত রাস্তায় দেখা গেল না।

শুধু সাংবাদিক বৈঠক আর সোশ্যাল মিডিয়া পোস্ট দিয়েই দায়িত্ব সেরেছে গেরুয়া শিবির। ফলে রাজনীতি চর্চার পাশাপাশি উঠছে একটাই প্রশ্ন— কলকাতার দুর্যোগে বিজেপি কোথায়?

বিজেপির সীমাবদ্ধ ভূমিকা

রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য মঙ্গলবার একটি সাংবাদিক বৈঠকে সরকারের ‘দুর্নীতি’, ‘অসতর্কতা’ ও ‘দূরদৃষ্টিহীনতা’-কে দায়ী করেন। বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীও নিজের জেলা থেকে মুখ্যমন্ত্রীকে আক্রমণ করেন সংবাদমাধ্যমের সামনে। বুধবার প্রাক্তন ডেপুটি মেয়র মীনাদেবী পুরোহিত এবং কাউন্সিলর সজল ঘোষও সাংবাদিক বৈঠকে শাসকদলকে কাঠগড়ায় তোলেন। কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যায়— শুধু বিবৃতি দিয়ে কি মানুষের পাশে দাঁড়ানো যায়?

দুর্গত কলকাতার রাস্তায় অদৃশ্য বিজেপি, দুর্যোগে ‘নিষ্ক্রিয়’ বিরোধী শিবিরের আম্ফালন শুধু সোশ্যাল মিডয়ায়

দুর্গত কলকাতার রাস্তায় অদৃশ্য বিজেপি, দুর্যোগে ‘নিষ্ক্রিয়’ বিরোধী শিবিরের আম্ফালন শুধু সোশ্যাল মিডয়ায়
দুর্গত কলকাতার রাস্তায় অদৃশ্য বিজেপি, দুর্যোগে ‘নিষ্ক্রিয়’ বিরোধী শিবিরের আম্ফালন শুধু সোশ্যাল মিডয়ায়

সংগঠিত ত্রাণ কার্যক্রমের অভাব

রাজ্য সভাপতির দাবি ছিল, বিজেপি কর্মীদের দুর্গত এলাকায় ত্রাণ ও শুকনো খাবার পৌঁছে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বাস্তবে দেখা গেল, খুব কমসংখ্যক কর্মী ব্যক্তিগত বা স্থানীয় উদ্যোগে মাঠে নেমেছেন। তবে রাজ্য বা জেলা স্তরে সংগঠিত উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। শহরের প্রত্যন্ত বস্তি থেকে মধ্যবিত্ত পাড়া— কোথাওই বিজেপির পক্ষ থেকে বড়সড় ত্রাণ কার্যক্রম চোখে পড়েনি।

সোশ্যাল মিডিয়া দিয়েই দায় সারা

মঙ্গলবার থেকেই বিজেপি কর্মীরা জলমগ্ন কলকাতার ছবি ও ভিডিও পোস্ট করতে শুরু করেন। কিছু ঘন্টা পরেই সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে নানা ‘ভেনিস’ কটাক্ষ ও ব্যঙ্গাত্মক পোস্ট। রাজ্য নেতৃত্বের অনেকেই দীর্ঘ লিখিত পোস্ট দিয়ে সরকারের ভুল ব্যাখ্যা করেছেন। কিন্তু সেই পোস্ট দুর্যোগে বিপর্যস্ত মানুষের কাছে কতটা গুরুত্ব পেল, তা নিয়েই প্রশ্ন উঠছে।

বিশ্লেষকদের হতাশা

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, রাজ্যের প্রধান বিরোধী শক্তির কাছ থেকে মানুষের প্রত্যাশা ছিল অনেক। এক প্রবীণ বিশ্লেষকের মন্তব্য, “রাজনীতি শুধু বক্তব্য নয়, মানুষের পাশে শারীরিকভাবে দাঁড়ানোই আসল কাজ। বিজেপির বর্তমান নেতৃত্ব সেই জনসংযোগের পাঠ ভুলে গেছেন।”

তিনি উদাহরণ টেনে বলেন, অতীতে প্রণব মুখোপাধ্যায়, প্রিয়রঞ্জন দাশমুন্সি বা সুব্রত মুখোপাধ্যায়রা নিজেরাই দলের বিবৃতি হাতে সংবাদমাধ্যমে পৌঁছে দিতেন। এমনকি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বা নরেন্দ্র মোদীর উত্থানও হয়েছে অবিরাম ময়দানে থাকার জন্য। আজকের নেতাদের সে অভ্যাস আর নেই।

সংগঠন নিয়ে প্রশ্ন

বিজেপির প্রবীণ নেতা রাজকমল পাঠক সরাসরি জানান, “সংগঠিত প্রয়াসের জন্য সংগঠিত টিম দরকার। কিন্তু শমীক ভট্টাচার্য সভাপতি হওয়ার এতদিন পরেও কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব তাঁকে নিজের টিম ঘোষণা করতে দেয়নি।”

অন্যদিকে, এক প্রাক্তন রাজ্য সাধারণ সম্পাদক মন্তব্য করেন, “দুর্যোগে রাজনীতি করার অভিযোগ উঠতে পারে, কিন্তু রাজনীতি ছাড়াও অনেক কিছু করার ছিল। বিজেপি সেটা করল না।”

কলকাতা বন্যা তৃণমূল সরকারকে বিপাকে ফেললেও বিজেপির ভূমিকাই এখন আলোচনায়। মানুষের আশা ছিল, বিরোধী শিবির রাস্তায় নেমে সাহায্যের হাত বাড়াবে। কিন্তু তার বদলে দেখা গেল সাংবাদিক বৈঠক ও সোশ্যাল মিডিয়ার ভিড়ে আটকে থাকা বিজেপি। রাজনৈতিক মহলের প্রশ্ন— রাজনীতি শুধু বক্তব্য দিয়ে হয়, নাকি দুর্যোগে মানুষের পাশে দাঁড়ানোই আসল বিরোধী রাজনীতি?

সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহুর্তে। আমাদের ফলো করুন
Google News Google News

সদ্য প্রকাশিত