বীরেন্দ্র কৃষ্ণ ভদ্র: এক কণ্ঠে বাঙালির মহালয়া, বছরে একদিন তাঁর জন্যই জেগে ওঠে কোটি হৃদয়

মহালয়ার ভোর মানেই বীরেন্দ্র কৃষ্ণ ভদ্র। কে ছিলেন এই কিংবদন্তি, জানুন তাঁর জীবন, কাজ ও উত্তরাধিকারীর গল্প।

নজরবন্দি ডিজিটাল ডেস্ক

সম্পাদকীয় প্রতিবেদন – অর্ক সানা: মহালয়ার ভোরে ভোর চারটায় যখন বেতারে ভেসে আসে মহিষাসুর মর্দিনী, তখন গোটা বাঙালি সমাজ একসাথে চুপচাপ কান পাতেন এক অদ্ভুত মায়াবী কণ্ঠের দিকে। তিনি আর কেউ নন—বীরেন্দ্র কৃষ্ণ ভদ্র। সারা বছর হয়তো নামটা মনে থাকে না, কিন্তু মহালয়ার দিনটি তাঁর কণ্ঠ ছাড়া অসম্পূর্ণ। প্রশ্ন জাগে—কে ছিলেন এই ব্যক্তিত্ব, যাঁর কণ্ঠ আজও পুজোর সূচনায় অপরিহার্য?

বীরেন্দ্র কৃষ্ণ ভদ্র (১৯০৫–১৯৯১) ছিলেন কলকাতার এক অনন্য সাংস্কৃতিক প্রতিভা। নাট্যকার, কথক, অভিনেতা, রেডিও সম্প্রচারক—সব ক্ষেত্রেই তিনি নিজের স্বাক্ষর রেখেছিলেন। তাঁর সময়কার দুই মহারথী, পঙ্কজ মল্লিক এবং কাজী নজরুল ইসলাম, ছিলেন তাঁর ঘনিষ্ঠ সমসাময়িক। তবে সাধারণ মানুষের কাছে তাঁর পরিচিতি গড়ে ওঠে একটাই কারণে—মহিষাসুর মর্দিনী

বীরেন্দ্র কৃষ্ণ ভদ্র: এক কণ্ঠে বাঙালির মহালয়া, বছরে একদিন তাঁর জন্যই জেগে ওঠে কোটি হৃদয়

বীরেন্দ্র কৃষ্ণ ভদ্র: এক কণ্ঠে বাঙালির মহালয়া, সারাবছর নিস্তব্ধ থাকলেও একদিন তাঁর জন্যই জেগে ওঠে কোটি হৃদয়
বীরেন্দ্র কৃষ্ণ ভদ্র: এক কণ্ঠে বাঙালির মহালয়া, বছরে একদিন তাঁর জন্যই জেগে ওঠে কোটি হৃদয়

শুরুটা ১৯৩১ সালে। অল ইন্ডিয়া রেডিও কলকাতা আয়োজন করল মহালয়ার বিশেষ অনুষ্ঠান। বাণী কুমারের লেখা চিত্রনাট্য, পঙ্কজ মল্লিকের সুর আর ভদ্রের আবৃত্তি মিলে তৈরি হল এক নতুন ইতিহাস। দেবী দুর্গার মহিষাসুর বধের সেই কাহিনি আজও অমর। ভদ্রের কণ্ঠস্বরই যেন বাঙালির পুজোয় দেবী আগমনের ডাক।

১৯৭৬ সালে অল ইন্ডিয়া রেডিও তাঁকে বাদ দিয়ে অভিনেতা উত্তম কুমারকে নিয়ে নতুন সংস্করণ পরিবেশন করে। কিন্তু দর্শকের প্রতিক্রিয়া এতটাই নেতিবাচক হয় যে কয়েক বছরের মধ্যেই ফের ফিরে আসে ভদ্রের কণ্ঠে রেকর্ড করা পুরনো মহিষাসুর মর্দিনী। এটাই প্রমাণ করে, একটি কণ্ঠস্বর কীভাবে বাঙালির আবেগের সঙ্গে মিশে গিয়েছিল।

বীরেন্দ্র কৃষ্ণ ভদ্র: এক কণ্ঠে বাঙালির মহালয়া, সারাবছর নিস্তব্ধ থাকলেও একদিন তাঁর জন্যই জেগে ওঠে কোটি হৃদয়
বীরেন্দ্র কৃষ্ণ ভদ্র: এক কণ্ঠে বাঙালির মহালয়া, সারাবছর নিস্তব্ধ থাকলেও একদিন তাঁর জন্যই জেগে ওঠে কোটি হৃদয়

কেবল রেডিও নয়, ভদ্রের অবদান বাংলা নাট্য ও চলচ্চিত্রেও সমান গুরুত্বপূর্ণ। তিনি মেস নং ৪৯ সহ একাধিক নাটক লিখেছেন। বিমল মিত্রের জনপ্রিয় উপন্যাসের মঞ্চরূপ সাহিব বিবি গুলাম পরিচালনা করেন তিনি। বঙ্কিমচন্দ্রের সুবর্ণ গোলকও তাঁর হাত ধরে রূপ নেয় বেতার নাটকে। বিখ্যাত বেতার নাটক শাহজাহান-এ ছবি বিশ্বাসকে দিয়ে কেন্দ্র চরিত্র ফুটিয়ে তোলার কৃতিত্বও তাঁর।

অভিনয়, পরিচালনা ও নাট্যরূপের পাশাপাশি তিনি নিশিদ্ধ ফল (১৯৫৫) সিনেমার চিত্রনাট্যও লিখেছিলেন। ফলে বলা যায়, বাংলা সংস্কৃতির প্রায় সব শাখাতেই তাঁর ছাপ স্পষ্ট।

তাঁর জন্ম ১৯০৫ সালের ৪ আগস্ট, উত্তর কলকাতার আহিরিটোলায়। আদি বাড়ি ছিল বাংলাদেশের সাতক্ষীরার উথলি গ্রামে। বাবা কালী কৃষ্ণ ভদ্র ছিলেন ১৪টি ভাষায় পারদর্শী ভাষাবিদ এবং পরে রায় বাহাদুর উপাধিতে ভূষিত হন। এমন সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলেই বড় হয়েছিলেন বীরেন্দ্র কৃষ্ণ। শিক্ষাজীবন কাটে কলকাতার স্কটিশ চার্চ কলেজে।

তাঁর অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে আজও উথলি গ্রামের দুর্গামন্দিরে পূজার সময় তাঁর নাম উচ্চারিত হয়। ২০০৬ সালে মহালয়ার দিন তাঁর মেয়ে সুজাতা ভদ্র বাবার কাজের স্বীকৃতি হিসেবে সারেগামা থেকে একটি সম্মাননামূলক চেক গ্রহণ করেন।

২০১৯ সালে হালুম ডিজিটাল মিডিয়ার উদ্যোগে মুক্তি পায় তথ্যচিত্র বীরেন্দ্র কৃষ্ণ ভদ্র – দ্য ভয়েস সিন্স ১৯৩৬। আবার ২০১৯ সালেই সৌমিক সেনের পরিচালনায় তৈরি হয় মহালয়া বায়োপিক, যেখানে শুভাশীষ মুখার্জি অভিনয় করেন ভদ্রের চরিত্রে।

আজকের দিনে যখন প্রযুক্তি বদলে দিয়েছে মানুষের শুনবার অভ্যাস, তখনও ভদ্রের কণ্ঠস্বর বাঙালির কাছে এক চিরন্তন আবেগ। মহালয়ার ভোর মানেই আজও সেই অমর উচ্চারণ—“জগতে জাগো মা…”। তিনি শুধু একজন আবৃত্তিকার নন, তিনি বাঙালির সাংস্কৃতিক সত্তার প্রতীক।

সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহুর্তে। আমাদের ফলো করুন
Google News Google News

সদ্য প্রকাশিত