বিহারে মদ নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার সওয়াল! রাজস্ব বাড়বে, বেআইনি কারবারও কমবে, দাবি গবেষণায়

বিহারে ২০১৬ থেকে চলা মদ নিষেধাজ্ঞা নিয়ে নতুন বিতর্ক। NCAER-এর গবেষণায় দাবি, নিষেধাজ্ঞা উঠলে রাজ্যের কর আদায় ১৪-১৫ শতাংশ বাড়তে পারে, কমতে পারে বেআইনি কারবারও।

নজরবন্দি ডিজিটাল ডেস্ক

বিহারে ২০১৬ সাল থেকে চালু থাকা মদ নিষেধাজ্ঞা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ন্যাশনাল কাউন্সিল অফ অ্যাপ্লায়েড ইকনমিক রিসার্চ (NCAER)-এর একটি গবেষণায় দাবি করা হয়েছে, মদ নিষিদ্ধ করার ফলে মহিলাদের বিরুদ্ধে অপরাধ কমার মতো কিছু ইতিবাচক প্রভাব দেখা গেলেও বেআইনি মদের কারবার, দুর্নীতি এবং বেআইনি মাদক ব্যবহারের প্রবণতা বেড়েছে। সেই কারণেই রাজ্যের উন্নয়ন ও পরিকাঠামো খাতে অর্থ জোগাড় করতে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।

অর্থনীতিবিদ রত্না সাহার নেতৃত্বে একদল গবেষক এই সমীক্ষা চালান। শুক্রবার ইন্ডিয়া পলিসি ফোরামে গবেষণাপত্রটি প্রকাশ করা হয়। সেখানে বলা হয়েছে, বিহারে মদ বিক্রির উপর নিষেধাজ্ঞা তুলে দিলে রাজ্যের কর আদায় প্রায় ১৪ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। সেই অতিরিক্ত রাজস্ব উন্নয়নমূলক এবং পরিকাঠামোগত কাজে ব্যবহার করা সম্ভব হবে বলে মত গবেষকদের।

শুধু রাজস্ব বাড়ার সম্ভাবনাই নয়, নিষেধাজ্ঞা কার্যকর রাখার জন্য প্রশাসনের যে বিপুল অর্থ ব্যয় হয়, সেই খরচও কমতে পারে বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে সরকারের হাতে উন্নয়ন প্রকল্পে বিনিয়োগের জন্য অতিরিক্ত অর্থ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

২০১৬ সালে মুখ্যমন্ত্রী নীতীশ কুমার (Nitish Kumar)-এর সরকার বিহারে ‘The Bihar Prohibition and Excise Act’ কার্যকর করে। এরপর রাজ্যজুড়ে মদ তৈরি, বিক্রি এবং পান নিষিদ্ধ হয়। মদ নিষিদ্ধ করার অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল সামাজিক সমস্যা কমানো এবং বিশেষ করে মহিলাদের নিরাপত্তা ও পরিবারের আর্থিক পরিস্থিতির উন্নতি ঘটানো।

NCAER-এর গবেষণায় অবশ্য এই নীতির কিছু ইতিবাচক ফলও স্বীকার করা হয়েছে। গবেষকদের দাবি, মদ নিষিদ্ধ হওয়ার পর মহিলাদের বিরুদ্ধে অপরাধের হার কমার প্রমাণ মিলেছে। অর্থাৎ সম্পূর্ণ ব্যর্থ নীতি হিসেবে নিষেধাজ্ঞাকে দেখেননি তাঁরা। কিন্তু একই সঙ্গে এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও যথেষ্ট গুরুতর বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।

গবেষণাপত্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ হল, বৈধ মদের বাজার বন্ধ হওয়ার পর বেআইনি মদের ব্যবসা উল্লেখযোগ্য ভাবে বেড়েছে। নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করতে গিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার উপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছে বলেও গবেষণায় দাবি করা হয়েছে। এর পাশাপাশি দুর্নীতি এবং বেআইনি মাদক-সহ অন্যান্য নেশার সামগ্রীর ব্যবহার বৃদ্ধির কথাও উঠে এসেছে।

গবেষকদের যুক্তি, মদ নিষিদ্ধ করলেই মানুষের মদ্যপানের প্রবণতা সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায় না। বরং বৈধ বাজার না থাকলে চাহিদার একটি অংশ বেআইনি বাজারের দিকে চলে যেতে পারে। সেখান থেকেই বিষাক্ত বা নিম্নমানের মদ, চোরাচালান এবং অপরাধমূলক চক্রের বিস্তার ঘটার আশঙ্কা তৈরি হয়। বিহারের ক্ষেত্রে এমন প্রবণতার প্রমাণ মিলেছে বলেই গবেষণাপত্রে দাবি করা হয়েছে।

রাজস্বের বিষয়টিও বিহারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। অন্যান্য অনেক রাজ্যের তুলনায় বিহারের নিজস্ব রাজস্ব সংগ্রহ এখনও কম। ফলে বড় উন্নয়ন প্রকল্প এবং পরিকাঠামো তৈরির ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় আর্থিক সহায়তার উপর রাজ্যকে অনেকটাই নির্ভর করতে হয়। গবেষকদের মতে, মদ নিষেধাজ্ঞা তুলে দিয়ে করের আওতায় একটি বড় বাজারকে ফিরিয়ে আনা গেলে রাজ্যের নিজস্ব আয় বাড়তে পারে।

বিহারের পরিস্থিতির সঙ্গে দেশের অন্য মদ-নিষিদ্ধ রাজ্যগুলির তুলনাও গবেষণায় উঠে এসেছে। গুজরাট এবং নাগাল্যান্ডেও মদ নিষিদ্ধ। মিজোরাম, মণিপুর এবং লাক্ষাদ্বীপের কিছু এলাকাতেও মদ বিক্রি ও পান নিয়ে বিধিনিষেধ রয়েছে। তবে গবেষকদের দাবি, বিহারে নিষেধাজ্ঞার আইন তুলনামূলক ভাবে বেশি কঠোর।

নীতীশ কুমারের সরকারের সময় আইনশৃঙ্খলার উন্নতি এবং রাজ্যকে উন্নয়নের পথে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার বিভিন্ন উদ্যোগের প্রশংসাও করা হয়েছে গবেষণাপত্রে। কিন্তু সেই উন্নয়নকে আরও গতি দিতে রাজ্যের নিজস্ব রাজস্বের পরিমাণ বাড়ানো জরুরি বলেই মত গবেষকদের।

অর্থাৎ NCAER-এর গবেষণার বক্তব্য সরাসরি মদ বিক্রিকে উৎসাহ দেওয়া নয়; বরং দীর্ঘমেয়াদি নিষেধাজ্ঞার সামাজিক লাভ ও অর্থনৈতিক খরচ—দুই দিকই বিবেচনা করার পর নীতি পুনর্বিবেচনার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এখন প্রশ্ন, গবেষকদের এই সুপারিশের পর বিহার সরকার আদৌ নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার কথা ভাববে কি না। রাজনৈতিক ও সামাজিক—দুই ক্ষেত্রেই বিষয়টি যে নতুন করে বড় বিতর্ক তৈরি করতে চলেছে, তা স্পষ্ট।

সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে

Google News Google News এবং Google Discover Google Discover -এ নজরবন্দি-কে Follow করে রাখুন।

আরও পড়ুন