ভূত চতুর্দশীতে কেন খাওয়া হয় ১৪ শাক? পুরাণে কী ব্যাখ্যা রয়েছে জানুন

ভূত চতুর্দশী ও চোদ্দ শাকের সম্পর্ক শুধু কুসংস্কার নয়, এর পেছনে রয়েছে পুরাণ, ঋতু পরিবর্তন ও স্বাস্থ্যের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা। জানুন কেন এই দিন ১৪ শাক খাওয়া জরুরি।

নজরবন্দি ডিজিটাল ডেস্ক

কালীপুজোর (Kali Puja) আগের দিন, অর্থাৎ ভূত চতুর্দশীর (Bhoot Chaturdashi) দিন প্রায় প্রতিটি বাঙালি ঘরেই রান্না হয় চোদ্দ শাক। ছোটবেলা থেকেই আমরা শুনে এসেছি—এই দিনে ১৪ শাক না খেলে নাকি ভূত ঘাড় মটকে দেয়! কিন্তু এর পেছনের গল্পটা শুধুই ভয় নয়, এর সঙ্গে যুক্ত আছে পুরাণ, ঋতু পরিবর্তনের প্রভাব এবং শরীরের প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধির এক গভীর বিজ্ঞান।


পুরাণে কী বলা আছে ভূত চতুর্দশী নিয়ে

হিন্দু পুরাণ অনুযায়ী, ভূত চতুর্দশীর দিনে মর্ত্যে নেমে আসেন ১৪ প্রকারের ভূত-প্রেত। তাদের থেকে গৃহ ও পরিবারকে রক্ষা করতে সন্ধ্যায় ১৪টি প্রদীপ জ্বালানোর রীতি প্রচলিত। একই সঙ্গে, শাস্ত্র অনুযায়ী এই দিনে ১৪ ধরনের শাক রান্না করে খাওয়া হয়, যা অশুভ শক্তি ও রোগবালাই দূর করে বলে বিশ্বাস করা হয়।

এই প্রথা শুধুমাত্র ধর্মীয় নয়, বরং প্রকৃতি ও স্বাস্থ্যের সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত।


শরীর ও ঋতুর পরিবর্তনের সঙ্গে সম্পর্ক

ভূত চতুর্দশী মানেই হেমন্ত ঋতুর সূচনা। এই সময় গরম কমে, ঠান্ডা বাড়ে—ফলে শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ে। নানা ভাইরাস, সর্দি-কাশি, জ্বর দেখা দেয়। তাই আয়ুর্বেদ মতে, এই সময় শরীরকে শক্তিশালী রাখার জন্য পুষ্টিগুণে ভরপুর শাকসবজি খাওয়া অত্যন্ত উপকারী।

১৪ শাকের মধ্যে থাকে নানা ধরনের পুষ্টি উপাদান, যা শরীরকে এই ঋতু পরিবর্তনের সময়ে সুস্থ রাখে। ফলে এই প্রথা কেবল ধর্মীয় বিশ্বাস নয়, প্রকৃতপক্ষে এটি একটি প্রাচীন স্বাস্থ্যচর্চার নিদর্শন।


চোদ্দ শাকের তালিকা ও তাদের উপকারিতা

শাস্ত্রে যে শাকগুলিকে ১৪ শাক বলা হয়েছে, তার মধ্যে রয়েছে—
পলতা, সর্ষে, নিমপাতা, শুশনি, জয়ন্তী, ওল শাক, ঘেঁটু বা ভাট, কেঁউ, বেতো, শেলুকা, হিঞ্চে, গুলঞ্চ, শাঞ্চে ও কালকাসুন্দে।

প্রতিটি শাকের নিজস্ব ঔষধি গুণ রয়েছে—

  • নিমপাতা ও গুলঞ্চ শাক শরীরকে বিষমুক্ত করে।

  • হিঞ্চে ও শাঞ্চে শাক হজমে সাহায্য করে।

  • সর্ষে ও জয়ন্তী শাক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়।

  • কালকাসুন্দে ও শুশনি শাক শরীরে ভিটামিন ও মিনারেল সরবরাহ করে।

এই কারণেই প্রাচীন ঋষি-মুনি থেকে আজও চলে আসছে ১৪ শাক খাওয়ার ঐতিহ্য।


চোদ্দ প্রদীপ ও ভূত তাড়ানোর রীতি

ভূত চতুর্দশীর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রথা হলো ১৪ প্রদীপ জ্বালানো। বিশ্বাস করা হয়, এই প্রদীপগুলি পূর্বপুরুষদের আত্মাকে শান্তি দেয় এবং অশুভ শক্তিকে দূরে রাখে। অনেকেই বাড়ির চার কোণে, দরজায় ও তুলসিতলায় প্রদীপ জ্বালান। এটি শুধুই ধর্মীয় বিশ্বাস নয়, বরং অন্ধকার ঘরে আলোর প্রতীক হিসেবেও দেখা হয়—যা শুভ শক্তির আগমনের প্রতীক।


২০২৫ সালে কবে ভূত চতুর্দশী?

এই বছর ভূত চতুর্দশী পড়েছে ১৯ অক্টোবর, রবিবারে, আর কালীপুজো হবে ২০ অক্টোবর। সেদিন প্রত্যেক বাঙালি ঘরেই জ্বলবে ১৪ প্রদীপ, আর রান্না হবে ১৪ শাক—পুরাণ, প্রথা ও স্বাস্থ্যের এক অনন্য মিলনের প্রতীক হিসেবে।


ভূত চতুর্দশীর ১৪ শাক খাওয়ার প্রথা কোনও কুসংস্কার নয়, বরং এটি প্রকৃতি ও শরীরের ভারসাম্য রক্ষার এক প্রাচীন বিজ্ঞান। ঋতু পরিবর্তনের সময় শরীরকে শক্ত রাখতেই আমাদের পূর্বপুরুষরা এই রীতির প্রচলন করেছিলেন। তাই আজও ভূত চতুর্দশীতে ১৪ শাক খাওয়ার রীতি একইভাবে প্রাসঙ্গিক ও বৈজ্ঞানিক।

সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহুর্তে। আমাদের ফলো করুন
Google News Google News

সদ্য প্রকাশিত