বাংলা ভাষা যেন আজ শুধুই ভাষা নয়, হয়ে উঠেছে আত্মপরিচয়ের এক অমূল্য অস্ত্র। আর এই অস্ত্রকেই রক্ষা করতে এবার সরব হলেন টলিউডের সুপারস্টার প্রসেনজিত চট্টোপাধ্যায়। বাংলাভাষীদের উপর বারবার ভিন রাজ্যে যে ভাবে আক্রমণ নেমে আসছে, তাতে ক্ষোভে ফেটে পড়েছে গোটা রাজ্য। এই পরিস্থিতিতে মঞ্চে উঠে বাংলার পাশে দাঁড়ালেন ইন্ডাস্ট্রির ‘জ্যেষ্ঠপুত্র’।
প্রসেনজিতের জোরাল বার্তা: ‘বাংলা ভাষা ছিল, আছে, থাকবে’
একুশে জুলাইয়ের মঞ্চে ভাষা সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যে প্রতিবাদে সামিল হয়েছিলেন, সেই একই সুরে এবার গলা মেলালেন প্রসেনজিত। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দিলেন, “বাংলা ভাষা ছিল, আছে, থাকবে। মুখ্যমন্ত্রীর পাশে আছি। এই লড়াই চালিয়ে যেতে হবে।”
চার দশকের বেশি সময় ধরে বাংলা চলচ্চিত্রে একচ্ছত্র আধিপত্য বজায় রাখা এই তারকা আরও বলেন, “এই ভাষাতেই আমি দর্শকের সঙ্গে কথা বলেছি, কাজ করেছি, নিজের পরিচিতি তৈরি করেছি। সেই ভাষাকে আজ অপমান করা হচ্ছে? এটা মেনে নেওয়া যায় না।”
ভাষার ‘অপরাধে’ অত্যাচার—বাঙালির ক্ষোভ চরমে
সম্প্রতি বিজেপি শাসিত একাধিক রাজ্যে বাংলা ভাষায় কথা বলার ‘অপরাধে’ বাঙালিদের হেনস্থা করার অভিযোগ সামনে এসেছে। কখনও বাংলাদেশি বলে অপমান, কখনও মারধর, পরিচয়পত্র কেড়ে নেওয়ার মতো ঘটনাও ঘটেছে। বাংলার পরিযায়ী শ্রমিকদের উপর এই ধরনের আক্রমণ ক্রমেই বেড়ে চলেছে বলে অভিযোগ।
এই প্রসঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় স্পষ্ট বার্তা দেন, বাংলাভাষীদের উপর এই ধরণের আচরণ মেনে নেওয়া হবে না। তিনি বলেন, “বাংলা ভারতের অন্যতম প্রধান ভাষা। এই ভাষার অপমান বাংলার অপমান।”
রূপম ইসলাম, কবীর সুমনের প্রতিবাদ
প্রসেনজিতের আগে সোচ্চার হয়েছেন বাংলার রকস্টার রূপম ইসলাম। সম্প্রতি এক্স (প্রাক্তন টুইটার)-এ তিনি লেখেন, “বাংলা ভাষা দেশের ২২টি সাংবিধানিক ভাষার একটি। তবু বাংলা বললেই বাংলাদেশি তকমা কেন দেওয়া হচ্ছে? এটা চরম মূর্খামির পরিচয়। ধিক্কার জানাই এই মানসিকতাকে।”
শুধু রূপমই নয়, গায়ক ও প্রাক্তন সাংসদ কবীর সুমনও এ বিষয়ে মুখ খোলেন। তিনি বলেন, “পশ্চিমবঙ্গের সব বিদ্যালয়ে বাংলা ভাষা আবশ্যিক করা উচিত। আমাদের নিজস্ব ভাষা যেন কোনো অবস্থাতেই অবহেলার শিকার না হয়।”
ভাষা মানেই পরিচয়, আত্মসম্মান ও অস্তিত্ব
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলা ভাষার উপর এই ধরণের আগ্রাসন শুধু ভাষাগত বৈষম্য নয়, এক ধরণের সাংস্কৃতিক আধিপত্যের ইঙ্গিত। ভাষা শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়, মানুষের আত্মপরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।
বাংলা ভাষা ভারতের অন্যতম প্রাচীন ও সমৃদ্ধ ভাষা। সাহিত্য, সংস্কৃতি, সিনেমা, নাটক— সব ক্ষেত্রেই এই ভাষার অবদান অনস্বীকার্য। অথচ আজ সেই ভাষা নিয়ে বারবার প্রশ্ন তোলা হচ্ছে, যা বাংলার সাধারণ মানুষের মনেও ক্ষোভের সঞ্চার করেছে।
ভাষা রক্ষার লড়াইয়ে রাজ্য সরকার এবং সংস্কৃতি জগতের ঐক্য
ভাষা-আক্রমণের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে এবার মুখ্যমন্ত্রীর পাশে দাঁড়ালেন শিল্পীমহল। প্রসেনজিত থেকে শুরু করে রূপম, কবীর সুমন— সবাই একযোগে জানিয়ে দিয়েছেন, বাংলা ভাষার মর্যাদা কোনোভাবেই ক্ষুণ্ণ হতে দেওয়া যাবে না।
এমন পরিস্থিতিতে রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকেও সচেতনতা বাড়ানোর পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। স্কুল, কলেজ, সরকারি কর্মস্থলে বাংলা ভাষার গুরুত্ব বোঝানোর মতো নানা কর্মসূচির কথা ভাবা হচ্ছে।
বাংলা ভাষা আজ কেবলমাত্র রাজ্যের গর্ব নয়, জাতীয় পরিচয়েরও অংশ। সেই ভাষার উপর যদি বারবার প্রশ্ন তোলা হয়, তবে তা শুধু এক ভাষার প্রতি অন্যায়ের প্রতিফলন নয়, গোটা সমাজের উদাসীনতার দৃষ্টান্ত হয়ে দাঁড়াবে।
এখন সময়, একসঙ্গে গলা তুলে বলার— বাংলা ভাষা ছিল, আছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে। এই লড়াই শুধু রাজনীতিবিদদের নয়, সাধারণ মানুষের, শিল্পীদের এবং নতুন প্রজন্মেরও।



