পশ্চিমবঙ্গে চলতি এসআইআর প্রক্রিয়া চলাকালীন এক বিস্ময়কর তথ্য উঠে এসেছে নির্বাচন কমিশনের হাতে। রাজ্যের ২২০৮ বুথে মৃত ভোটার শূন্য, এমনটাই দাবি বুথ লেভেলের এনুমারেশন ডেটায়। আরও চমকপ্রদ বিষয়—এই সব বুথে বিলি হওয়া প্রতিটি এনুমারেশন ফর্মও নাকি পূরণ হয়ে ফেরত এসেছে। অর্থাৎ কোনও ফর্মই বাকি নেই। নেই মৃত ভোটার, নেই ভুয়ো ভোটার, এমনকি এমন একজন ভোটারও নেই যাঁর খোঁজ মিলছে না।
স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে, এসআইআর প্রক্রিয়ায় এটা আদৌ সম্ভব? এই প্রশ্ন ওঠার পরই কমিশন সব জেলার উদ্দেশে কড়া নির্দেশ পাঠিয়েছে। যে বুথগুলিতে ফেরত না আসা ফর্মের সংখ্যা শূন্য থেকে বিশের মধ্যে রয়েছে, সেগুলিতে অতিরিক্ত নজরদারি চালাতে বলা হয়েছে।


এই তালিকার শীর্ষে রয়েছে দক্ষিণ ২৪ পরগনা। ওই জেলার ৭৬০ বুথে একটিও মৃত ভোটার নেই বলে দাবি এসেছে। এরপর তালিকায় রয়েছে পুরুলিয়া (২২৮ বুথ) এবং মুর্শিদাবাদ (২২৬ বুথ)। হাওড়ায় সেরকম বুথের সংখ্যা ৯৪, আর কলকাতায় দেখা গেছে মাত্র একটি বুথে এই অস্বাভাবিক চিত্র।
বাংলার ২২০৮ বুথে মৃত ভোটার ‘০’; স্ক্যানারে দক্ষিণ ২৪ পরগনা, বড় নির্দেশ কমিশনের
নির্বাচন কমিশনের এক আধিকারিক জানিয়েছেন, দক্ষিণ ২৪ পরগনা, পুরুলিয়া, মুর্শিদাবাদ এবং হাওড়া জেলার সংশ্লিষ্ট আধিকারিকদের কাছে রিপোর্ট তলব করা হয়েছে। তাঁর বক্তব্য, এসব বুথে মৃত ভোটার নেই, ভুয়ো ভোটার নেই, এমনকি অনুপস্থিত কোনও ভোটারও নেই—ফলে এই বুথগুলি এখন আতসকাচের নিচে। এনুমারেশন ডেটা খতিয়ে দেখা হচ্ছে আরও গভীরভাবে।

এসআইআর প্রক্রিয়ার এই পর্যায়ে কমিশন বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে ফর্ম যাচাই ও ডিজিটাল আপলোডে। কারণ, মৃত ভোটার বা ভুয়ো নাম শনাক্ত করা এই পর্যায়ের অন্যতম মূল উদ্দেশ্য। ফলে কোনও বুথে মৃত ভোটার শূন্য হওয়া অবশ্যই নজর কাড়ার মতো ঘটনা।


রাজ্যের নির্বাচনী পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, সোমবার বিকেল পর্যন্ত মোট ৭,৬৫,৬২,৪৮৬ ফর্ম বিলি করা হয়েছে। অর্থাৎ প্রায় ৯৯.৯ শতাংশ ভোটার পরিবারের হাতে ফর্ম পৌঁছে গেছে। এর মধ্যে অনলাইনে আপলোড হয়েছে ৭,৩৮,৫৭,০২৩টি ফর্ম, যা BLO–দের বিলি করা ফর্মের ৯৬.৩৭ শতাংশ। এত বিশাল তথ্য সংগ্রহের মাঝে এই ২২০৮ বুথের ব্যতিক্রমী পরিসংখ্যান স্বভাবতই কৌতূহলের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কমিশন ইতিমধ্যেই জানিয়েছে, ১১ ডিসেম্বর পর্যন্ত এনুমারেশন ফর্ম জমা নেওয়া হবে। ১৬ ডিসেম্বর প্রকাশ পাবে খসড়া ভোটার তালিকা। এরপর শুনানি ও সংশোধনের প্রক্রিয়া চলবে ৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ হবে ১৪ ফেব্রুয়ারি।
এসআইআর প্রক্রিয়া বরাবরই গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এই প্রক্রিয়ার ওপরই নির্ভর করে ভোটার তালিকার নির্ভুলতা। তাই ২২০৮ বুথে মৃত ভোটার শূন্য হওয়ার দাবি নিয়ে কমিশন কোনও ঝুঁকি নিতে নারাজ। বরং প্রতিটি তথ্য এবার যাচাই হবে বহুগুণ কঠোরভাবে।
রাজনৈতিক মহলে ইতিমধ্যে এই ঘটনাকে ঘিরে প্রশ্ন উঠেছে। বিরোধীরা দাবি করছে, এমন রিপোর্ট বাস্তবে অসম্ভব। শাসক শিবির বলছে, সাধারণ মানুষের সচেতনতা বেড়েছে বলেই এমন প্রত্যাশিত ফল মিলছে। তবে কমিশনের অবস্থান স্পষ্ট—কোনও অনুমান নয়, কেবল তথ্য-ভিত্তিক যাচাইয়ের ওপরই নির্ভর করবে এসআইআর প্রক্রিয়ার পরবর্তী পদক্ষেপ।
ফলে এখন পুরো রাজ্যের নজর একটাই প্রশ্নে—এই ২২০৮ বুথে সত্যিই কি মৃত ভোটার নেই, নাকি আরও বড় কোনও অসঙ্গতি লুকিয়ে আছে? সেই উত্তর দেবে কমিশনের পরবর্তী রিপোর্টই।








