পাকিস্তানের ক্ষমতার কেন্দ্রে বড় রদবদল ঘটল। দেশের প্রথম Chief of Defence Forces (CDF) হিসেবে নিয়োগ পেলেন জেনারেল আসিম মুনির। এই সিদ্ধান্তের ফলে আগামী পাঁচ বছর পাকিস্তানের সেনা, বায়ুসেনা ও নৌসেনার সর্বময় ক্ষমতা কার্যত তাঁর হাতেই কেন্দ্রীভূত হল। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, পাকিস্তানের nuclear weapons command বা পরমাণু অস্ত্র ব্যবহারের নিয়ন্ত্রণও এবার মুনিরের অধীনে আসছে। এই কারণেই আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহলে তৈরি হয়েছে নতুন উদ্বেগ।
গত কয়েক দশক ধরে পাকিস্তানে পরমাণু অস্ত্র ব্যবহারের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতেন প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রী। সেনাপ্রধান কেবল সামরিক পরামর্শ দিতেন। কিন্তু CDF-পদ প্রবর্তনের পরে সেই সমীকরণ বদলে গেছে। নতুন বিধান অনুযায়ী, পরমাণু শক্তি প্রয়োগের ক্ষেত্রে মুনিরের ভূমিকা এখন হবে প্রধান ও প্রভাবশালী। পাকিস্তানের রাজনীতিতে এটি এক নজিরবিহীন ক্ষমতা-কেন্দ্রীকরণ।


মুনিরের হাতেই পাকিস্তানের পরমাণু বটন, প্রথম CDF হিসেবে বিপুল ক্ষমতার অধিকারী
গত মাসেই পাকিস্তান সংবিধানের ২৭তম সংশোধনী পাস হয়, যার মাধ্যমে নতুন এই পদ তৈরি করা হয়। যদিও রাজনৈতিক মহলের সূত্র বলছে, প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ প্রথম দিকে এত বিপুল ক্ষমতা মুনিরের হাতে দিতে রাজি ছিলেন না। কারণ, পাকিস্তানের রাজনীতিতে সেনাবাহিনীর প্রভাব বরাবরই প্রবল, আর শেহবাজ সরকারের নিয়ন্ত্রণ আরও কমে যাওয়ার আশঙ্কা থেকেই সংশয় প্রকাশ করেছিলেন তিনি।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত পরিবর্তন ঘটাতে পারেননি প্রধানমন্ত্রী। সেনাবাহিনী প্রধান হিসেবে মুনিরের তিন বছরের কার্যকালের মেয়াদ গত সপ্তাহে শেষ হয়েছিল। তখনই ধারণা করা হচ্ছিল, তাঁকে নতুন দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে। যদিও বিলম্ব হওয়ায় রাজনৈতিক জল্পনা আরও তীব্রতর হয়েছিল। অবশেষে প্রেসিডেন্টের অফিস থেকে এক্স-এ ঘোষিত হয় যে, COAS-এর পাশাপাশি Chief of Defence Forces পদেও আসিম মুনিরই দায়িত্ব নিচ্ছেন, এবং তা প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফের সুপারিশে।
পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, এটি শুধু একটি পদোন্নতি নয়; এটি রাষ্ট্রযন্ত্রের নিয়ন্ত্রণের কাঠামোতে বড়সড় পরিবর্তনের নাম। এখন থেকে সেনা-সংক্রান্ত যাবতীয় সিদ্ধান্ত, নিয়োগ, কৌশলগত নীতি—সবকিছুর উপর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন মুনির। Vice Chief of Army Staff নিয়োগের ক্ষমতাও তাঁরই হাতে যাবে, যা আগে রাজনৈতিক নেতৃত্বের হাতে ছিল।



কূটনৈতিক মহলের আশঙ্কা আরও বেড়েছে মুনিরের অতীত মন্তব্যকে কেন্দ্র করে। চলতি বছর এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেছিলেন, যদি পাকিস্তান ধ্বংসের পথে এগোয়, তবে তারা “অর্ধেক বিশ্বকে সঙ্গে নিয়ে ধ্বংস হতে প্রস্তুত”, কারণ তারা একটি nuclear capable nation। এই বক্তব্য তখনই যথেষ্ট বিতর্ক সৃষ্টি করেছিল। সেই মুনিরের হাতেই এখন পরমাণু অস্ত্রের বাস্তব নিয়ন্ত্রণ আসায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পাকিস্তানের মত রাজনৈতিকভাবে অস্থির রাষ্ট্রে এ ধরনের ক্ষমতা-কেন্দ্রীকরণ গণতান্ত্রিক কাঠামোর উপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে। সরকারের উপর সেনাবাহিনীর দাপট আরও বৃদ্ধি পাবে, এবং নীতি-নির্ধারণী স্তর আরও সামরিকমুখী হয়ে উঠতে পারে।
অন্যদিকে, মুনিরের সমর্থকরা দাবি করছেন, পাকিস্তান বর্তমানে সীমান্ত উত্তেজনা, অভ্যন্তরীণ জঙ্গি হুমকি ও আর্থিক সংকটের মধ্যে রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে শক্তিশালী একক নেতৃত্বই দেশকে স্থিতিশীল করতে পারে।
সামনের পাঁচ বছর এই দ্বৈত ক্ষমতা কীভাবে পাকিস্তানের রাজনীতি, দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তাকে প্রভাবিত করবে, তা নিয়ে এখন থেকেই আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—পাকিস্তানের ক্ষমতা কাঠামো বদলে গেছে, এবং তার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন জেনারেল আসিম মুনির।







