নজরবন্দি ব্যুরো: অন্নপূর্ণা যোজনার টাকা না পাওয়া নিয়ে রাজ্যের একাধিক এলাকায় মহিলাদের বিক্ষোভের মধ্যেই শনিবার কড়া বার্তা দিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari)। ভবানীপুরের কর্মসূচি থেকে তাঁর দাবি, প্রকৃত যোগ্য কোনও মহিলা মাসিক ৩,০০০ টাকার অন্নপূর্ণা যোজনার সুবিধা থেকে বঞ্চিত হবেন না। একই সঙ্গে বিক্ষোভের নেপথ্যে তৃণমূল কংগ্রেসকে (Trinamool Congress) দায়ী করে তাঁর কটাক্ষ, “২০ জন লোক জড়ো করে, রিল বানিয়ে, ধমক-চমক দিয়ে, মিডিয়া ট্রায়াল করে কোনও লাভ নেই।”
গত কয়েক দিন ধরেই অন্নপূর্ণা যোজনার টাকা না পাওয়া নিয়ে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে ক্ষোভ-বিক্ষোভের খবর সামনে এসেছে। কোথাও পথ অবরোধ, কোথাও বিডিও অফিস ও স্থানীয় প্রশাসনিক দফতরের সামনে বিক্ষোভ হয়েছে। বিভিন্ন জেলার মহিলাদের অভিযোগ, যোগ্য হওয়া সত্ত্বেও তাঁদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে ৩,০০০ টাকার ভাতা পৌঁছয়নি।
এই পরিস্থিতিতে শনিবার নিজের বিধানসভা কেন্দ্র ভবানীপুরের সুভাষ উদ্যানে অন্নপূর্ণা যোজনার উপভোক্তাদের একটি কর্মসূচিতে বক্তব্য রাখেন মুখ্যমন্ত্রী। সেখান থেকেই তিনি স্পষ্ট করে দেন, যাচাই-বাছাইয়ের কারণে কারও নাম আপাতত আটকে থাকলেও প্রকৃত যোগ্যদের বাদ দেওয়ার পরিকল্পনা সরকারের নেই।
শুভেন্দুর দাবি, অগস্ট মাসে ইতিমধ্যেই ১ কোটি ৪৫ লক্ষ মহিলা অন্নপূর্ণা যোজনার সুবিধা পেয়েছেন। তবে উপভোক্তার সংখ্যা এখানেই থেমে থাকবে না। আরও ২০ থেকে ৩০ লক্ষ মহিলা যদি যাচাইয়ের পরে প্রকৃত দাবিদার হিসেবে বিবেচিত হন, তাঁদেরও ভাতার আওতায় আনার ব্যবস্থা করা হবে বলে আশ্বাস দিয়েছেন তিনি।
ভবানীপুরের পরিসংখ্যান তুলে ধরে মুখ্যমন্ত্রী জানান, চলতি মাসে ওই বিধানসভা কেন্দ্রে প্রায় ১৪,৫০০-র বেশি মহিলা অন্নপূর্ণা যোজনার টাকা পেয়েছেন। আরও প্রায় আড়াই হাজার নাম অনুমোদিত হয়েছে বলে তাঁকে জানানো হয়েছে। অনুমোদিত ওই মহিলাদের অ্যাকাউন্টেও নিয়ম অনুযায়ী প্রতি মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে টাকা পাঠানো হবে বলে জানিয়েছেন তিনি।
অন্নপূর্ণা যোজনায় সুবিধাভোগীর সংখ্যা গত কয়েক মাসে দ্রুত বেড়েছে বলেও দাবি করেন শুভেন্দু। তাঁর দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, জুনে ২৮ লক্ষ মহিলা প্রকল্পের আওতায় ছিলেন। জুলাইয়ে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১ কোটি ১৯ লক্ষে। অগস্টে তা আরও বেড়ে হয়েছে ১ কোটি ৪৫ লক্ষ। সাম্প্রতিক সরকারি তথ্যেও অগস্টে ১ কোটি ৪৫ লক্ষ মহিলাকে ৩,০০০ টাকা করে দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে।
তবে এই তালিকা তৈরি করতে গিয়ে বেশ কিছু আবেদন আটকে যাওয়ায় ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, মোট আবেদনকারীর মধ্যে যাচাইয়ের পরে প্রায় ১৭ লক্ষ আবেদন বাতিল বা আটকে রয়েছে। ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট ও আধার সংযোগের সমস্যা-সহ বিভিন্ন কারণে কিছু আবেদন প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ হয়নি। যোগ্যতার প্রমাণ দিতে পারলে পরবর্তী পর্যায়ে তাঁদের সুযোগ দেওয়ার ব্যবস্থাও করা হচ্ছে।
বিক্ষোভের প্রসঙ্গ উঠতেই রাজনৈতিক আক্রমণের সুর আরও চড়ান মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর অভিযোগ, তৃণমূল সাধারণ মানুষকে ভুল বুঝিয়ে অন্নপূর্ণা যোজনাকে ঘিরে আন্দোলনের পরিস্থিতি তৈরি করছে। তাঁর বক্তব্য, অল্প সংখ্যক মানুষকে সামনে এনে রিল তৈরি বা মিডিয়া ট্রায়ালের মাধ্যমে সরকারকে চাপে ফেলা যাবে না।
শুভেন্দুর কথায়, “ধমক-চমক দিয়ে, রিল বানিয়ে, আর মিডিয়া ট্রায়াল করে, ২০ জন লোককে রাস্তায় নামিয়ে” কোনও লাভ হবে না। একই সঙ্গে তৃণমূলের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়েও কটাক্ষ করেন তিনি। তাঁর দাবি, পরাজয়ের পরে তৃণমূল এখন খণ্ড-বিখণ্ড হয়ে গিয়েছে এবং এই ধরনের কৌশলে বর্তমান সরকারকে নত করা সম্ভব নয়।
অন্নপূর্ণা যোজনা নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে চলা সমালোচনা নিয়েও মহিলাদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য, সমাজমাধ্যমে নানা ধরনের মন্তব্য দেখে উপভোক্তাদের বিচলিত হওয়ার প্রয়োজন নেই। প্রকৃত যোগ্যদের তালিকা যাচাই করে তাঁদের সুবিধা নিশ্চিত করাই সরকারের লক্ষ্য।
এ দিন পূর্বতন তৃণমূল সরকারের মহিলা ভাতার প্রসঙ্গও টেনে আনেন শুভেন্দু। তাঁর দাবি, ২০২১ সালে ৫০০ টাকা দিয়ে শুরু করা হয়েছিল এবং ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের আগে তা ১,০০০ টাকা ও বিধানসভা নির্বাচনের আগে ১,৫০০ টাকা করা হয়েছিল। এই তুলনা টেনে বর্তমান সরকারের ৩,০০০ টাকার অন্নপূর্ণা ভাতাকে তুলে ধরেন তিনি।
পাশাপাশি পূর্বতন সরকারের আমলে রাজনৈতিক কারণে বিজেপি কর্মী-সমর্থকদের পরিবারের মহিলারা সরকারি সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন বলেও অভিযোগ করেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর দাবি, বিশেষ করে ২০১৯ সালে বিজেপি জিতেছিল এমন এলাকার মহিলাদের ক্ষেত্রে এমন বঞ্চনা হয়েছে। বর্তমান সরকার আর্থিকভাবে দুর্বল এবং প্রকৃত যোগ্যদের অগ্রাধিকার দেবে বলে ফের আশ্বাস দেন তিনি।
অন্নপূর্ণা যোজনা নিয়ে ক্ষোভের আবহে সরকারের পরবর্তী পদক্ষেপও তাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ, প্রথম দফায় ১ কোটি ৪৫ লক্ষ মহিলা টাকা পেলেও আরও আবেদন যাচাইয়ের পর্যায়ে রয়েছে। সরকারের তরফে ইতিমধ্যেই জানানো হয়েছে, যাচাই সম্পূর্ণ হলে প্রকৃত যোগ্যদের পরবর্তী পর্যায়ে সুবিধা দেওয়ার সুযোগ থাকবে।
এর মধ্যেই আগামী ১৭ সেপ্টেম্বর রাজ্যজুড়ে ‘অন্নপূর্ণা দিবস’ পালনের ঘোষণা করেছেন শুভেন্দু। দিনটি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর (Narendra Modi) জন্মদিন। মুখ্যমন্ত্রীর ঘোষণা, ওই দিন কলকাতায় ১ লক্ষ অন্নপূর্ণা যোজনার উপভোক্তাকে নিয়ে একটি সভা করা হবে। ফলে অন্নপূর্ণা যোজনার টাকা নিয়ে মাঠে ক্ষোভ-বিক্ষোভ এবং সরকারের পাল্টা রাজনৈতিক আক্রমণ—দুইয়ের মাঝেই এখন নজর আগামী দফার যাচাই ও টাকা পাওয়ার দিকে।



