নজরবন্দি ব্যুরো: অন্নপূর্ণা যোজনার টাকা কার অ্যাকাউন্টে ঢুকবে, আর কার আবেদন বাতিল হতে পারে—এ বার সেই তালিকা অনেকটাই স্পষ্ট। নবান্নে সাংবাদিক বৈঠক করে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari) জানিয়েছেন, আবেদনপত্রের যাচাই-বাছাইয়ের কাজ শেষ পর্যায়ে। যোগ্য উপভোক্তাদের অ্যাকাউন্টে আগামী ১৭ আগস্ট থেকে টাকা পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু হবে বলে জানিয়েছেন তিনি। মাসে ৩ হাজার টাকা পাওয়ার ক্ষেত্রে বয়সের পাশাপাশি আয়, জমি, চাকরি এবং পরিবারের আর্থিক অবস্থার একাধিক শর্তও রয়েছে।
অন্নপূর্ণা যোজনায় ২৫ থেকে ৬০ বছর বয়সি যোগ্য মহিলারা মাসে ৩ হাজার টাকা করে আর্থিক সহায়তা পাবেন। প্রকল্পটি ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষ থেকে চালু হয়েছে এবং আগের লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের পরিবর্তে এই প্রকল্পে যোগ্য মহিলাদের সরাসরি আর্থিক সহায়তা দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
তবে বয়স ২৫ থেকে ৬০ বছরের মধ্যে হলেই যে টাকা পাওয়া যাবে, এমনটা নয়। মুখ্যমন্ত্রীর ঘোষণা অনুযায়ী, নির্দিষ্ট আয়ের সীমা পেরিয়ে গেলে আবেদনকারী অন্নপূর্ণা যোজনার সুবিধা পাবেন না। মাসে ১০ হাজার টাকা আয় করেন এমন মহিলাও এই প্রকল্পের আওতায় থাকবেন না বলে জানিয়েছেন তিনি।
পারিবারিক আয়ের ক্ষেত্রেও রয়েছে নির্দিষ্ট সীমা। কোনও পরিবারের বার্ষিক আয় ১২ লক্ষ টাকা হলে সেই পরিবারের মহিলা অন্নপূর্ণা যোজনার টাকা পাবেন না। অর্থাৎ, শুধু ব্যক্তিগত আয় নয়, পরিবারের সামগ্রিক আর্থিক অবস্থাও যাচাইয়ের আওতায় থাকছে।
জমির মালিকানার ক্ষেত্রেও রয়েছে আলাদা নিয়ম। মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, সাতটি পুরনিগম এলাকার কোনও বাসিন্দার ৫০ ডেসিমেলের বেশি জমি থাকলে তিনি অন্নপূর্ণা যোজনার সুবিধা পাবেন না। তবে গ্রামীণ এলাকার ক্ষেত্রে জমির পরিমাণ সংক্রান্ত এই নিয়মে কিছুটা ছাড় দেওয়া হয়েছে।
সরকারি চাকরির ক্ষেত্রেও শর্ত বেশ কড়া। কেন্দ্র বা রাজ্য সরকার, পঞ্চায়েত, পুরসভা কিংবা সরকারি ও সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ব্যক্তি বা পরিবারের ক্ষেত্রে অন্নপূর্ণা যোজনার সুবিধা মিলবে না। স্থায়ী সরকারি চাকরি কিংবা নিয়মিত সরকারি বেতন পাওয়ার বিষয়টিও অযোগ্যতার মধ্যে পড়ছে। প্রকল্পের প্রাথমিক যোগ্যতার ক্ষেত্রে সরকারি চাকরি ও আয়করদাতাদের বাদ দেওয়ার কথা আগেই জানানো হয়েছিল।
তবে বেসরকারি সংস্থায় কর্মরত ঠিকা শ্রমিকদের ক্ষেত্রে নিয়মটি আলাদা। তাঁদের পরিবারের সদস্যেরা অন্নপূর্ণা যোজনার জন্য আবেদন করতে পারবেন বলে জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। অর্থাৎ, শুধু কোনও পরিবারের সদস্য কাজ করেন কি না, সেটিই শেষ কথা নয়; কাজের ধরন এবং সংশ্লিষ্ট আর্থিক যোগ্যতাও বিবেচনায় রাখা হচ্ছে।
অন্য কোনও সরকারি ভাতা পেলেই অবশ্য অন্নপূর্ণার টাকা পুরোপুরি বন্ধ হবে না। ২৫ থেকে ৬০ বছরের মধ্যে কোনও মহিলা ৩ হাজার টাকার কম ভাতা পেলে—যেমন বিধবা ভাতা ১,৫০০ টাকা—সাধারণ নিয়মে তিনি অন্নপূর্ণা যোজনার ৩ হাজার টাকাই পাবেন। অর্থাৎ দু’টি ভাতা যোগ করে ৪,৫০০ টাকা পাওয়ার সুযোগ থাকবে না।
তবে এই নিয়মের দু’টি ক্ষেত্রে বিশেষ ছাড় রয়েছে। দিব্যাঙ্গ ভাতা যাঁরা পান, তাঁরা সেই ভাতার পাশাপাশি অন্নপূর্ণা যোজনার ৩ হাজার টাকাও পাবেন বলে জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। একই ভাবে PM-KISAN-এর আওতায় থাকা কৃষক পরিবারের মহিলা সদস্যেরাও অন্নপূর্ণা যোজনার ৩ হাজার টাকা পেতে পারবেন।
বাড়ির ক্ষেত্রেও শুরুতে একটি নির্দিষ্ট শর্ত রাখা হয়েছিল। তিন কক্ষের বাড়ি থাকলে অন্নপূর্ণা যোজনার সুবিধা পাওয়া যাবে না বলে জানানো হয়েছিল। তবে মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, গ্রামীণ এলাকার ক্ষেত্রে এই শর্ত শিথিল করা হয়েছে।
এ বার মূল প্রশ্ন, অন্নপূর্ণা যোজনার টাকা কবে ঢুকবে? মুখ্যমন্ত্রীর ঘোষণা অনুযায়ী, যাঁদের আবেদনপত্রের যাচাই সম্পূর্ণ হয়েছে এবং যাঁরা যোগ্য বলে বিবেচিত হয়েছেন, তাঁদের অ্যাকাউন্টে ১৭ আগস্ট থেকে টাকা পাঠানো শুরু হবে। অর্থ দফতর জেলা ধরে ধরে DBT-এর মাধ্যমে টাকা পাঠানোর ব্যবস্থা করবে।
পরবর্তী সময়েও যাচাইয়ের কাজ চলবে। যাঁদের ভেরিফিকেশন সম্পূর্ণ হবে, তাঁদের নিয়মিত ভাবে প্রতি মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে টাকা দেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে বলে জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। ফলে প্রথম দফায় নাম না থাকলেও যাচাই সম্পূর্ণ হওয়ার পরে যোগ্য উপভোক্তার অ্যাকাউন্টে টাকা আসতে পারে।
অন্নপূর্ণা যোজনার প্রথম দফার তালিকা নিয়ে অভিযোগ ওঠার পরেই নতুন করে যাচাইয়ের উপর জোর দিয়েছে রাজ্য সরকার। প্রশাসনের হিসাবে, জুনে প্রায় ২৮ লক্ষ মহিলা এই প্রকল্পের টাকা পেয়েছিলেন। জুলাইয়ে সেই সংখ্যা বেড়ে প্রায় ১ কোটি ১৯ লক্ষে পৌঁছেছে বলে মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন। আগামী কিস্তিতে উপভোক্তার সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।
প্রকল্পের খরচ নিয়েও ইতিমধ্যে হিসাব শুরু হয়েছে। ২০২৬-২৭ সালের বাজেটে অন্নপূর্ণা যোজনার জন্য ৩৬ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। তবে উপভোক্তার সংখ্যা বাড়লে চলতি অর্থবর্ষে প্রকল্পের মোট খরচ আরও বাড়তে পারে বলে প্রশাসনিক মহলে হিসাব চলছে।
যোগ্য হয়েও টাকা পাননি—এমন অভিযোগের ক্ষেত্রেও ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। অন্নপূর্ণা যোজনা নিয়ে অভিযোগ জানানোর জন্য আলাদা পোর্টাল তৈরি করা হবে এবং ব্লক স্তরে বিডিও-দের দায়িত্ব দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন তিনি। পুরো বিষয়টি নজরদারিতে রাখবেন মুখ্যসচিব।
ফলে অন্নপূর্ণা যোজনায় শুধু আবেদন করলেই মাসে ৩ হাজার টাকা নিশ্চিত নয়। বয়স, ব্যক্তিগত ও পারিবারিক আয়, জমি, চাকরি, বাড়ির ধরন এবং অন্যান্য সরকারি সুবিধা—সব দিক যাচাই করেই চূড়ান্ত তালিকা তৈরি হবে। যাঁদের নথি ও যোগ্যতা যাচাই সম্পূর্ণ, তাঁদের অ্যাকাউন্টে ১৭ আগস্ট থেকে টাকা পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার ঘোষণাই এখন সবচেয়ে বড় খবর।



