‘চিকেনস নেক’ সুরক্ষায় বড় পদক্ষেপ, ১৮৯ কোটির প্রকল্পে শিলান্যাস অমিত শাহের

শিলিগুড়ি করিডরের নিরাপত্তা জোরদারে প্রায় ১৮৯ কোটি টাকার প্রকল্পের শিলান্যাস অমিত শাহের। জমি হস্তান্তর, ত্রিকোণীয় নিরাপত্তা গ্রিড ও SSB-এর ভূমিকা নিয়ে বড় বার্তা।

নজরবন্দি ডিজিটাল ডেস্ক

শিলিগুড়ি করিডর বা ‘চিকেনস নেক’-এর নিরাপত্তা আরও জোরদার করতে একাধিক পদক্ষেপের কথা জানাল কেন্দ্রীয় সরকার। শুক্রবার শিলিগুড়ির রানিডাঙায় সশস্ত্র সীমা বল (SSB)-এর উত্তরবঙ্গ ফ্রন্টিয়ার হেডকোয়ার্টারে প্রায় ১৮৯ কোটি টাকার প্রশাসনিক ও আবাসিক প্রকল্পের শিলান্যাস এবং কয়েকটি প্রকল্পের উদ্বোধন করেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ (Amit Shah)। অনুষ্ঠানে সীমান্ত নিরাপত্তা থেকে জমি হস্তান্তর—একাধিক বিষয়ে বক্তব্য রাখার পাশাপাশি রাজ্যের বর্তমান সরকারকে প্রশংসা এবং প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে (Mamata Banerjee) নিশানা করেন তিনি।

অমিত শাহ জানান, শিলিগুড়ি করিডরের নিরাপত্তাকে আরও শক্তিশালী করতে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক বিশেষ ‘ত্রিকোণীয় নিরাপত্তা গ্রিড’ তৈরি করেছে। চোপড়া, কিশানগঞ্জ এবং ধুবড়িকে কেন্দ্র করে করিডরের উপর নজরদারি, নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক উপস্থিতি বাড়ানো হয়েছে বলে দাবি তাঁর। পাশাপাশি নিয়মিত সামরিক মহড়ার মাধ্যমে এই কৌশলগত অঞ্চলকে সুরক্ষিত রাখার কথাও জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

শাহের বক্তব্য অনুযায়ী, সীমান্ত নিরাপত্তার পরিকাঠামো গড়ে তুলতে দীর্ঘদিন ধরেই জমির প্রয়োজন ছিল কেন্দ্রের। ২০১৪ সাল থেকে প্রায় ১১২৯ একর জমি চাওয়া হলেও তা পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি। তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে একাধিকবার আবেদন করেও জমি মেলেনি বলে দাবি করে শাহ বলেন, জমির জন্য তিনি ‘হাতে-পায়ে ধরে’ ক্লান্ত হয়ে গিয়েছিলেন।

সীমান্ত পরিকাঠামোর প্রসঙ্গ তুলে অমিত শাহ আরও দাবি করেন, শিলিগুড়ি করিডরকে শক্তিশালী করার জন্য কেন্দ্রীয় সংস্থাগুলির প্রায় ৫৬০ একর জমির প্রয়োজন ছিল। সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া দেওয়ার জন্যও জমির প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেন তিনি। তাঁর অভিযোগ, পূর্বতন রাজ্য সরকারের কাছ থেকে বারবার অনুরোধ করা সত্ত্বেও সেই জমি পাওয়া যায়নি।

তবে রাজ্যে সরকার পরিবর্তনের পর পরিস্থিতি বদলেছে বলে দাবি করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য, মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari) দায়িত্ব নেওয়ার পর জাতীয় নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। শাহের দাবি, নতুন সরকার গঠনের মাত্র ৪৫ দিনের মধ্যে বিএসএফ (BSF) এবং এসএসবির জমি সংক্রান্ত জটিলতা মিটিয়ে ১১২৯ একর জমি হস্তান্তর করা হয়েছে।

অমিত শাহ আরও জানান, বাকি থাকা ২৯ একর জমির অনুমোদনের বিষয়েও দ্রুত পদক্ষেপের আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। প্রাতরাশের সময় এ বিষয়ে আলোচনা হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি। তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট, সীমান্ত পরিকাঠামো এবং নিরাপত্তার প্রশ্নে কেন্দ্র-রাজ্য সমন্বয়ের বিষয়টিকেই বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

শিলিগুড়ি করিডরের কৌশলগত গুরুত্বের কথাও এদিন উঠে আসে। উত্তর-পূর্ব ভারতের সঙ্গে দেশের বাকি অংশের যোগাযোগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্থলপথ এই সরু করিডর। ফলে এই অঞ্চলের নিরাপত্তা, সীমান্ত পরিস্থিতি এবং পরিকাঠামোকে কেন্দ্রের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হয়।

এসএসবির ভূমিকারও প্রশংসা করেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য, ১৯৬৫ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করে আসছেন এই বাহিনীর জওয়ানরা। কার্গিল যুদ্ধের পর ‘ওয়ান বর্ডার, ওয়ান ফোর্স’ নীতির আওতায় এসএসবিকে ভারত-নেপাল এবং ভারত-ভুটান সীমান্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়।

সরকারি ব্যবস্থাপনা অনুযায়ী, এসএসবি ভারত-নেপাল সীমান্তের প্রায় ১৭৫১ কিলোমিটার এবং ভারত-ভুটান সীমান্তের প্রায় ৬৯৯ কিলোমিটার অংশ পাহারা দেয়। এই দুই সীমান্তের বড় অংশই কাঁটাতারবিহীন ও উন্মুক্ত। প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে স্বাভাবিক সম্পর্ক বজায় রেখেও সেখানে দিন-রাত নজরদারি চালানো কঠিন বলে মন্তব্য করেন শাহ।

‘ওয়ান বর্ডার, ওয়ান ফোর্স’ নীতির কথাও বিস্তারিত ভাবে তুলে ধরেন তিনি। এই নীতির মূল উদ্দেশ্য হল প্রতিটি আন্তর্জাতিক সীমান্তের নির্দিষ্ট অংশের নিরাপত্তার দায়িত্ব একটি নির্দিষ্ট সীমান্তরক্ষী বাহিনীর হাতে রাখা। কেন্দ্রের মতে, এতে কমান্ড কাঠামো স্পষ্ট হয় এবং সীমান্তে নজরদারি আরও কার্যকর করা সম্ভব হয়।

অমিত শাহের বক্তব্যে রাজনৈতিক আক্রমণের সুরও ছিল স্পষ্ট। পূর্বতন সরকারের আমলে সীমান্ত নিরাপত্তার জন্য জমি না পাওয়ার অভিযোগ তুলে তিনি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিশানা করেন। পাশাপাশি বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর দ্রুত জমি হস্তান্তরের সিদ্ধান্তের প্রশংসা করেন তিনি।

শাহ আরও বলেন, এসএসবির অনুষ্ঠানে তিনি অতীতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে একাধিকবার আমন্ত্রণ জানালেও তিনি আসতে চাইতেন না। অন্যদিকে বর্তমান মুখ্যমন্ত্রীকে আমন্ত্রণ জানানো হলে তিনি অনুষ্ঠানে এসেছেন বলেও মন্তব্য করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। ফলে নিরাপত্তা ও পরিকাঠামোর সরকারি কর্মসূচির মঞ্চ থেকেই রাজ্যের প্রাক্তন ও বর্তমান সরকারের কাজের তুলনা টেনে রাজনৈতিক বার্তাও দিলেন তিনি।

সব মিলিয়ে, শুক্রবারের কর্মসূচিতে শিলিগুড়ি করিডরের নিরাপত্তা, সীমান্ত পরিকাঠামো এবং কেন্দ্র-রাজ্য সমন্বয়—এই তিনটি বিষয় বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। প্রায় ১৮৯ কোটি টাকার প্রকল্পের পাশাপাশি জমি হস্তান্তর এবং নিরাপত্তা গ্রিডের কথা সামনে এনে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বার্তা, উত্তরবঙ্গের এই কৌশলগত অঞ্চলের নিরাপত্তায় আর কোনও ফাঁক রাখতে চাইছে না কেন্দ্র।

সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে

Google News Google News এবং Google Discover Google Discover -এ নজরবন্দি-কে Follow করে রাখুন।

আরও পড়ুন