লোকসভা নির্বাচনে বহরমপুর কেন্দ্র থেকে অপ্রত্যাশিতভাবে হেরে গিয়েছেন পাঁচ বারের কংগ্রেস সাংসদ অধীর রঞ্জন চৌধুরী। শেষমেশ আশা ছিল, তাঁকে হয়তো রাজ্যের দায়িত্বে রাখা হবে। কিন্তু সেগুড়েও বালি! প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতির পদ থেকেও অধীরকে সরিয়ে দেবার সিদ্ধান্ত নিয়েছে হাই কমান্ড। তাঁর জায়গায় এসেছেন শুভঙ্কর সরকার। এখন, অধীরের রাজনৈতিক ভবিষ্যত ঠিক কোন দিকে তা নিয়ে চলছে জল্পনা।
রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে ‘কট্টরপন্থী’ মনোভাব রাখতেন বলেই কি অধীরকে সরিয়ে দিলেন সনিয়া গান্ধী বা মল্লিকার্জুন খাড়গেরা? কারণ, শুভঙ্কর সরকার মমতা বিরোধিতার প্রশ্নে কিছুটা হলেও নরমপন্থী বলেই পরিচিত। আগামী দিনে কি কংগ্রেসের সাথে তৃণমূলের সমঝোতা হতে পারে এ রাজ্যে? কারণ, সর্বভারতীয় পর্যায়ে দু’টি দলই একে অপরের শরিক, অর্থাৎ, ইন্ডিয়া জোটের অংশ। তৃণমূলের সাথে এ রাজ্যে কংগ্রেসের সমঝোতা হলে কি মেনে নেবেন অধীর? কি সিদ্ধান্ত নেবেন তিনি? কোন কোন পথ খোলা থাকছে তাঁর জন্য?


প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতির পদে না থাকলেও অধীর হাত শিবিরের সর্বভারতীয় ওয়ার্কিং কমিটির সদস্য এখনও। পদ কেড়ে নেওয়ার পরে অধীর রঞ্জন চৌধুরী নাকি বেশ কিছুটা বিমর্ষ হয়ে পড়েন। তাঁর ঘনিষ্ঠ একাধিক কংগ্রেস নেতার ফোন তিনি ধরেননি। যদিও তার পরের দিন, আরজি কর ধর্ষণ ও খুন মামলার প্রতিবাদে কলকাতায় কংগ্রেসের মিছিলের একেবারে সামনের সারিতে দেখা যায় অধীরকে।
সদ্য সমাপ্ত লোকসভা নির্বাচনে অধীর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ওপেন চ্যালেঞ্জ করে বলেছিলেন, আমার বিরুদ্ধে এসে দাঁড়ান বহরমপুরে, আমি হারিয়ে দেখাব! সেখানে দেখা গেল, রাজনীতিতে নবাগত সুদূর গুজরাতের বাসিন্দা তৃণমূলের ক্রিকেটার প্রার্থী ইউসুফ পাঠানের কাছেই তরী ডুবে গেল বহরমপুরের টাইগারের। হারের কারণ হিসাবে অধীর হাইকমান্ডকে জানান, হিন্দু ও মুসলিম ভোট মেরুকরণের কারণেই তিনি হেরে গিয়েছেন। এই হারের পর থেকেই অধীরের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে নানান প্রশ্ন উঠেছিল।
রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, অধীরকে প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি থেকে সরিয়ে দিয়ে স্পষ্ট দুই বার্তা দিল কংগ্রেস হাই কমান্ড। এক, অতিরিক্ত তৃণমূল বা মমতা বন্দোপাধ্যায়ের বিরোধিতা করা চলবে না। দুই, সিপিআইএমের সঙ্গে এই গাঁটছড়া নিয়ে পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন। একুশের বিধানসভা নির্বাচন থেকেই হাতে হাত ধরে চলে আসছে বামফ্রন্ট ও কংগ্রেস। লোকসভা নির্বাচনেও যার অন্যথা হয়নি। বিধানসভায় দু’টি দল একটিও আসন না পেলেও লোকসভায় কংগ্রেস সর্বসাকুল্যে একটি আসন পেয়েছে।


অর্থাৎ, হাত শিবির মনে করছে সিপিআইএমের কংগ্রেসকে প্রয়োজন। কংগ্রেসের ততটাও নয়। কিন্তু লোকসভা নির্বাচনের আগে মমতার তরফে কংগ্রেসের সঙ্গে আসন ভাগাভাগি নিয়ে কথা হলেও তাতে একেবারে মত ছিল না অধীরের। অনেকে বলেন, সেখানে কাজ করেছিল মহম্মদ সেলিমের মস্তিষ্ক! তাঁরা দু’জন মিলে পরিকল্পনা করেছিলেন, তৃণমূলকে হারানোর। তাই পাশাপাশি এসে দাঁড়িয়েছিলেন। কিন্তু যার কোনটাই সত্যি হয়নি। কিন্তু অধীরের বামমনোভাবাপন্ন অতীতই এখন অনেকটাই প্রাসঙ্গিক। কেন?
আগামী দিনে যদি রাজ্যে কংগ্রেসের সঙ্গে তৃণমূলের সমঝোতা হয়, বলাই বাহুল্য তা কোনও ভাবেই মেনে নেবেন না অধীর চৌধুরী! একটা কথা তিনি বারবার বলেছেন, কংগ্রেসের স্বার্থে আমি মমতা বন্দোপাধ্যায় বা তৃণমূলের বিরোধিতা করেছি। এ রাজ্যে কংগ্রেসের বর্তমান অবস্থার জন্য যদি কেউ দায়ী থাকে, তাহলে তিনি একমাত্র মমতা। ফলে তৃণমূলনেত্রীর সঙ্গে অধীরের আপোস কোনো ভাবেই সম্ভব নয়। কিন্তু যে কংগ্রেসের জন্য তিনি দীর্ঘদিন ধরে এ রাজ্যে লড়াই চালিয়ে গেলেন, প্রতিদানে তিনি কি পেলেন? এই প্রশ্নটা এবার করাটা খুব স্বাভাবিক। সে ক্ষেত্রে তিনি কী করবেন? অনেকে বলছেন, ২৬ বিধানসভায় অধীরকে বিধায়ক পদের প্রার্থী করতে পারে কংগ্রেস। কারণ, শুরুর জীবনের নবগ্রামের বিধায়ক ছিলেন তিনি। আগামী দিনে চাইলে তিনি বিধানসভায় প্রার্থী হতেই পারেন, সেক্ষেত্রে জিতলে হয়তো কিছুটা মানসিক শান্তি ফিরে পাবেন। কারণ, লোকসভা ভোট আবার পাঁচ বছর পর।
অন্য আরেকটি তত্ত্ব উঠে আসছে, বামেদের সঙ্গে অধীরের ঘনিষ্ঠতা। আর শুধু ঘনিষ্ঠতা তো নয়, অনেকেই জানেন, অধীর চৌধুরী একসময় আরএসপি করতেন। মনে করা হচ্ছে, তৃণমূলের সঙ্গে কংগ্রেস যদি আপোস করে, তাহলে দল ছেড়ে দিতে পারেন অধীর চৌধুরী! এবং, অসমর্থিত সূত্রে খবর, তিনি ফিরে আসতে পারেন নিজের পুরনো দল আরএসপিতে। এখন আগামী দিনে অধীর ঠিক কি সিদ্ধান্ত নেন সেদিকেই নজর রয়েছে রাজনৈতিক মহলের।







