এসআইআর (SIR) ঘিরে যখন রাজ্যজুড়ে রাজনৈতিক উত্তাপ চরমে, ঠিক তখনই সংগঠনকে “দুই ফ্রন্টে” একসঙ্গে মাঠে নামাতে কড়া নির্দেশ দিলেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। শনিবার দলের প্রায় ১ লক্ষ পদাধিকারীর সঙ্গে ভার্চুয়াল বৈঠকে তিনি স্পষ্ট করে দিলেন—দিনের বেলা এসআইআর সংক্রান্ত কাজ, আর সন্ধ্যার পর পাড়ায় পাড়ায় সরকারি প্রকল্পের প্রচারে সিনেমা প্রদর্শন। বার্তা একটাই—ভোটার তালিকার লড়াই চলবে, আবার সরকারের উন্নয়ন প্রচারও থামবে না।
বৈঠক থেকে অভিষেক জানিয়ে দেন, এসআইআর আবহে যাতে রাজ্য সরকারের কাজের প্রচার “ব্যাহত” না হয়, সেই লক্ষ্যেই প্রতিদিনের কাজ সময় বেঁধে সাজাতে হবে। তাঁর নির্দেশ—দিনে মাঠে নামতে হবে এসআইআর সংক্রান্ত যাচাই-বাছাই ও সহায়তায়, আর রাত হলেই এলাকায় এলাকায় পর্দা টানিয়ে দেখাতে হবে রাজ্য সরকারের প্রকল্প নিয়ে তৈরি ছবি ‘লক্ষ্মী এল ঘরে’।
‘লক্ষ্মী এল ঘরে’ দেখানো হবে পাড়ায় পাড়ায়, আগে মাইকে প্রচারও
অভিষেকের নির্দেশ অনুযায়ী, যে এলাকায় সিনেমা প্রদর্শিত হবে তার আগে মাইকিং করে স্থানীয় মানুষকে আগাম জানাতে হবে। দলের অন্দরেই শোনা যাচ্ছে—এই সিনেমার মাধ্যমে একদিকে যেমন সরকারের প্রকল্পের সুফল তুলে ধরা হবে, তেমনই জনসংযোগ আরও জোরদার করা হবে বুথ স্তর পর্যন্ত।
এমনকি সিনেমা দেখানোর পর খাবার আয়োজন নিয়েও অভিষেক নেতৃত্বকে “স্বাধীনতা” দিয়েছেন। বৈঠকে তিনি বলেন, কোথাও কোথাও সিনেমা শেষে খাওয়াদাওয়ার আয়োজন হচ্ছে—সেটা স্থানীয় নেতৃত্ব চাইলে করতে পারে। তবে রাজনৈতিক মহলের ব্যাখ্যা, এই কথার মধ্যে দিয়ে অভিষেক বুঝিয়ে দিলেন—শুধু প্রদর্শন নয়, মানুষের সঙ্গে “সম্পর্ক”ও তৈরি করতে হবে।
সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশকে ‘জয়’ বলেই তুলে ধরলেন অভিষেক
প্রায় ৭০ মিনিটের বক্তব্যের শুরুতেই অভিষেক সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণ এবং নির্দেশকে তৃণমূলের সাফল্য হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। তাঁর দাবি, তৃণমূল যে বিষয়গুলো তুলে ধরেছিল আদালত তার অনেকটাই গুরুত্ব দিয়েছে।


এরপরই তিনি এসআইআরের শুনানি পর্ব নিয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশ দেন—শুনানিতে ডাক পাওয়া কোনও ভোটারকে একা ছাড়বেন না। দলের নিযুক্ত BLA (Booth Level Agent)-দের সঙ্গে ভোটারদের যেতে হবে, যাতে প্রক্রিয়ায় কোনও অনিয়ম বা চাপ তৈরি না হয়।
‘লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি’ তালিকা ঝুললেই শুরু হবে টানা ১০ দিনের লড়াই
সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী, ‘লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি’ থাকা ভোটারদের নাম ওয়ার্ড ও পঞ্চায়েতভিত্তিক তালিকা আকারে প্রকাশ করতে হবে। কিন্তু শনিবার বিকেল সাড়ে ৪টে নাগাদ অভিষেক জানান, বৈঠকের আগেও তিনি খোঁজ নিয়েছেন—অনেক জায়গায় তালিকা এখনও টাঙানো হয়নি।

তাঁর নির্দেশ, তালিকা টাঙানো হলেই এরপরের ১০ দিন নাওয়া-খাওয়া ভুলে শুধুই এই কাজ করতে হবে—বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোটারদের বুঝিয়ে, নথি জোগাড় করে, শুনানির প্রস্তুতি সম্পূর্ণ করতে হবে।
অনুমোদনপত্র, ‘দিদির দূত’ অ্যাপ—তথ্য আপলোডেও নজরদারি
দলীয় সূত্রে জানা যাচ্ছে, ভোটার প্রতি BLA-দের জন্য অনুমোদনপত্রের নির্দিষ্ট ফরম্যাট খুব দ্রুত জেলা নেতৃত্বের কাছে পাঠানো হবে। বিধানসভাভিত্তিক সেগুলি ছাপিয়ে প্রস্তুত রাখতে বলা হয়েছে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশ—ভোটারের নথি কমিশনের পোর্টালে আপলোড হওয়ার পরে একই তথ্য ‘দিদির দূত’ অ্যাপ-এও আপলোড করতে হবে। উদ্দেশ্য—কমিশনের প্রক্রিয়ার উপর দলীয়ভাবে নজর রাখা এবং কোনও জায়গায় সমস্যার ইঙ্গিত পেলেই দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া।
কমিশনের নির্দেশিকায় ‘ফাঁদ’ আছে? অভিষেকের অভিযোগ
শুনানিতে BLA-দের যুক্ত করার বিষয়েও কমিশনের নির্দেশিকা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেন অভিষেক। তাঁর বক্তব্য, আদালত বলেছে ভোটার চাইলে শুনানিকেন্দ্রে যেতে পারেন এবং চাইলে BLA-কে সঙ্গে নিতে পারেন। কিন্তু কমিশনের নির্দেশিকায় ভোটারদের উপস্থিতিকে “বাধ্যতামূলক” করে তোলার চেষ্টা রয়েছে।
এই কারণেই তিনি বললেন—আপাতত সব ভোটারের সঙ্গে BLA-দের যেতে হবে। কাউকে একা ছাড়বেন না। পাশাপাশি বুথ স্তরে তৈরি হবে ভোট অধিকার রক্ষা কমিটি, যারা শুনানিতে ডাকা ভোটারদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে বোঝাবে—কেন ডাকা হয়েছে, কী নথি লাগবে, কোথায় জমা দিতে হবে।
‘মাইক্রো অবজার্ভার পোর্টাল’ নিয়ে সতর্ক করলেন দলকে
বৈঠকে অভিষেক আরও একটি কৌশলগত বিষয় উল্লেখ করেন—কমিশন নাকি মাইক্রো অবজার্ভারদের জন্য আলাদা পোর্টাল তৈরির নির্দেশ দিয়েছে জেলা আধিকারিকদের। অভিষেক জানান, এমন খবর পেলেই দলকে সঙ্গে সঙ্গে জানাতে হবে। তাঁর মতে, এই পদক্ষেপ বেআইনি হতে পারে এবং প্রয়োজনে আবার আদালতের দ্বারস্থ হওয়ার বার্তা দেন তিনি।
জাতীয় ভোটার দিবসে রাজ্যজুড়ে বিক্ষোভের নির্দেশ
বৈঠকের শুরুতে প্রারম্ভিক ভাষণ দেন তৃণমূলের রাজ্য সভাপতি সুব্রত বক্সী। তিনি জানান, ২৫ জানুয়ারি জাতীয় ভোটার দিবস উপলক্ষে রাজ্যজুড়ে ব্লকে ব্লকে এসআইআরে হয়রানির প্রতিবাদে বিক্ষোভ কর্মসূচি করতে হবে।
সাংসদদের ‘এলাকায় ফিরতে’ কড়া নির্দেশ: ২৪-৪৮ ঘণ্টায় ওয়াররুম সক্রিয় করো
অভিষেক অভিযোগ করেন, বিভিন্ন এলাকায় এসআইআর সংক্রান্ত দলের ওয়াররুম ঠিকমতো কাজ করছে না। তিনি সাংসদদের নির্দেশ দেন—আগামী ২৪-৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই সব ওয়াররুম সচল করতে হবে।
তাঁর বার্তা ছিল কড়া—এখন দিল্লিতে থাকার দরকার নেই, বাজেটের দিন ছাড়া বাকি সময় এলাকায় থাকুন। প্রয়োজনে নিজের খরচে সংগঠনের কাজ চালাতে হবে। পাশাপাশি আগামী ১৫ দিন ধরে তিন দিন অন্তর জেলা নির্বাচনী আধিকারিকদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে সমন্বয় করার নির্দেশও দেন তিনি। দৈনিক রিপোর্ট পাঠানো বাধ্যতামূলক বলেও জানানো হয়।
‘উন্নয়নের পাঁচালি’ থামবে না: প্রচার চলবে সমান্তরালভাবে
এসআইআর-এর টানাপোড়েনের মাঝেও তৃণমূল চাইছে সরকারের ১৫ বছরের প্রকল্প ও উন্নয়নের খতিয়ান মানুষের কাছে পৌঁছাতে। ইতিমধ্যেই প্রকাশিত হয়েছে ‘উন্নয়নের পাঁচালি’, যা মহিলা তৃণমূল পাড়ায় পাড়ায় প্রচার করছে। অভিষেক নির্দেশ দেন—এই প্রচার চলতেই থাকবে। অর্থাৎ, এসআইআরের পাশাপাশি উন্নয়ন প্রচারও সমান গতিতে চালাতে হবে।








