অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে ঘিরে তৃণমূলের অন্দরে অসন্তোষ ক্রমশ প্রকাশ্যে আসছে। ভোটে ধাক্কার পর একের পর এক নেতা প্রকাশ্যে ক্ষোভ উগরে দিলেও এখনও পর্যন্ত কোনও সাংগঠনিক পদক্ষেপ করেননি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ফলে রাজনৈতিক মহলে এখন বড় প্রশ্ন—দলের ভিতরে চাপ বাড়লেও কেন অভিষেক প্রশ্নে নীরব রয়েছেন তৃণমূল নেত্রী?
দলের অন্দরমহলের একাংশের অভিযোগ, সাম্প্রতিক সময়ে সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত, নির্বাচনী কৌশল এবং কিছু নির্দিষ্ট পরামর্শদাতা গোষ্ঠীর ভূমিকা নিয়ে তীব্র অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। সেই ক্ষোভের বড় অংশই গিয়ে পড়ছে তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপর।
প্রথমদিকে অসন্তোষ প্রকাশ করেছিলেন এমন কিছু নেতা, যাঁদের অনেকেই পরবর্তী সময়ে তৃণমূলে যোগ দিয়েছিলেন। কিন্তু পরিস্থিতি নতুন মোড় নেয় যখন দীর্ঘদিনের তৃণমূল নেতা ও সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ও প্রকাশ্যে অভিমান ও ক্ষোভের কথা বলতে শুরু করেন।
রাজনৈতিক মহলের মতে, কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় শুধু একজন সাংসদ নন, তিনি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দীর্ঘ রাজনৈতিক লড়াইয়ের সঙ্গী। তাই তাঁর মতো নেতার প্রকাশ্য মন্তব্য দলীয় অন্দরের পরিস্থিতির গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় সম্প্রতি ইঙ্গিতপূর্ণ ভাষায় জানিয়েছেন, দলের ভিতরে তাঁর মতো নেতাদেরও অস্বস্তিকর পরিস্থিতির মুখে পড়তে হচ্ছে। তাঁর বক্তব্য ঘিরে তৃণমূলের অন্দরে জল্পনা আরও তীব্র হয়েছে।
শুধু কল্যাণ নন, কাকলি ঘোষ দস্তিদার, অনুব্রত মণ্ডল, সুখেন্দু শেখর রায়ের মতো একাধিক প্রবীণ তৃণমূল নেতার মধ্যেও অভিষেককে নিয়ে অসন্তোষ রয়েছে বলে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা চলছে। যদিও দল আনুষ্ঠানিকভাবে এই বিষয়ে কোনও মন্তব্য করেনি।
এদিকে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়কে সম্মান জানান। তিনি বলেন, কল্যাণবাবুর তাঁর সম্পর্কে মন্তব্য করার অধিকার রয়েছে এবং তিনি সবসময় তাঁকে শ্রদ্ধা করবেন।
অন্যদিকে কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ও সুর নরম করে জানান, অভিষেক তাঁর সন্তানের মতো। ভুল বোঝাবুঝি দূর হলে তাঁকে তিনি বুকে টেনে নেবেন। একইসঙ্গে তিনি স্পষ্ট করেন যে তিনি এখনও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গেই রয়েছেন এবং সামনে বড় রাজনৈতিক লড়াই রয়েছে।
তবে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে—দলের মধ্যে এত আলোচনা ও সমালোচনার পরও কেন অভিষেকের বিরুদ্ধে কোনও সাংগঠনিক পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে না? রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, আগামী দিনের তৃণমূল নেতৃত্বের ক্ষেত্রে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে গুরুত্বপূর্ণ মুখ হিসেবেই দেখছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
তৃণমূলের ইতিহাসে যুব সংগঠনের নেতৃত্ব থেকে শুরু করে সংগঠনের বিস্তারে অভিষেকের ভূমিকা ক্রমশ বেড়েছে। সেই কারণেই বর্তমান পরিস্থিতিতেও তাঁর উপর আস্থা বজায় রাখছেন দলনেত্রী, এমন মতও রয়েছে রাজনৈতিক মহলের একাংশের।
দলত্যাগ, সাংগঠনিক পুনর্গঠন এবং ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের প্রশ্নে তৃণমূলের ভিতরে যে নতুন সমীকরণ তৈরি হচ্ছে, তার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। ফলে মমতার নীরবতা কৌশলগত, নাকি ভবিষ্যতের কোনও বড় সিদ্ধান্তের পূর্বাভাস—সেই প্রশ্নের উত্তর এখন খুঁজছে রাজ্যের রাজনৈতিক মহল।



