রাজ্য বিধানসভা নির্বাচন আর এক বছরের অপেক্ষা। তার আগেই সংগঠন ঢেলে সাজাতে কোমর বেঁধে মাঠে নামলেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। জেলা ধরে ধরে বৈঠক শুরু করলেন তিনি। এই প্রক্রিয়ার প্রথম ধাপে কোচবিহার জেলার নেতৃত্বের সঙ্গে দীর্ঘক্ষণ বৈঠক করলেন অভিষেক।
জেলা বৈঠকে বিজেপিকে রুখতে রাজনৈতিক বার্তা
শনিবার কলকাতার ক্যামাক স্ট্রিটে এই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন কোচবিহারের জেলা সভাপতি অভিজিৎ দে ভৌমিক, উত্তরবঙ্গ উন্নয়ন মন্ত্রী উদয়ন গুহ-সহ তৃণমূলের শীর্ষ নেতারা। বৈঠকে উঠে আসে একটি স্পষ্ট অভিযোগ— অসমের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মার নাম করে কোচবিহারের সাধারণ মানুষকে ভয় দেখানো হচ্ছে।


জেলা সভাপতি অভিজিৎবাবুর অভিযোগ, বারবার এনআরসি-র তালিকা দেখিয়ে বিভ্রান্ত করা হচ্ছে মানুষকে। বিজেপি কর্মীরা এমন বার্তা দিচ্ছেন যেন তৃণমূলের নেতা-কর্মীরা তাঁদের পায়ে পড়ে ক্ষমা চাইতে বাধ্য হন। এই প্রসঙ্গে অভিষেক স্পষ্ট জানান, এই ভয় দেখানোর রাজনীতি রাজনৈতিকভাবেই রুখতে হবে।
অসম সীমান্তে বাংলার সংস্কৃতি রক্ষার বার্তা
কোচবিহার সীমান্তবর্তী জেলা হওয়ায় বিজেপির আগ্রাসী অবস্থান এখানে চোখে পড়ার মতো। তাই এই জেলায় বাংলাভাষার অস্তিত্ব এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রক্ষার আন্দোলন জোরদার করার বার্তা দিয়েছেন অভিষেক। তিনি বলেন, “ভয় দেখিয়ে, জাতপাতের বিভাজন তৈরি করে বিজেপি কিছু করতে পারবে না। মানুষের সঙ্গে থেকে সত্যিকারের লড়াই চালিয়ে যেতে হবে।”
বুথভিত্তিক প্রচারে জোর, লক্ষ্য ২০২৬
বৈঠকে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় পরিষ্কার জানিয়ে দেন, কোচবিহার লোকসভা কেন্দ্রের জয় ধরে রাখতে হবে যেকোনও মূল্যে। এজন্য ব্লক ধরে ধরে, বুথ ধরে ধরে প্রচারে নামার নির্দেশ দেন তিনি। তৃণমূলের তরফে এই মুহূর্তে মূল লক্ষ্য, আগামী বিধানসভা নির্বাচনে কোচবিহারে নিজেদের দখল অটুট রাখা।


লোকসভা নির্বাচনে নিশীথ প্রামাণিককে পরাস্ত করে জিতেছেন তৃণমূলের জগদীশ চন্দ্র বর্মা বসুনিয়া। তাই সংগঠন আরও শক্তিশালী করতে এখন থেকেই রণকৌশল নির্ধারণ করছেন অভিষেক। বুথস্তরে নেতা-কর্মীদের সক্রিয় করতে চাইছেন তিনি।
এনআরসি ইস্যুতে রাস্তায় নামছে তৃণমূল
এনআরসি ইস্যুতে কোচবিহারে বিজেপির ভূমিকার প্রতিবাদে সরাসরি রাস্তায় নামার সিদ্ধান্ত নিয়েছে তৃণমূল। দলের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, মঙ্গলবার কোচবিহার জেলার ১৯টি স্থানে বিক্ষোভ সভার আয়োজন করা হবে। এর মাধ্যমে ভোটারদের কাছে স্পষ্ট বার্তা পৌঁছে দিতে চাইছে শাসকদল যে, তারা এনআরসি এবং নাগরিকত্ব নিয়ে কেন্দ্রের আগ্রাসন রুখতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ।
গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের অভিযোগ খারিজ করলেন জেলা সভাপতি
এদিকে কোচবিহারে তৃণমূলের গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব নিয়ে ওঠা অভিযোগ একেবারে উড়িয়ে দিয়েছেন জেলা সভাপতি অভিজিৎ দে ভৌমিক। তিনি বলেন, “আমাদের মধ্যে কোনও দ্বন্দ্ব নেই। কেউ যদি দাবি করে যে দ্বন্দ্ব আছে, তাহলে সেটা প্রমাণ করুক মেপে।” তৃণমূল সূত্রে খবর, এই বৈঠকে সাংগঠনিক স্তরে কিছু গুরুত্বপূর্ণ রদবদল নিয়েও আলোচনা হয়েছে। শীঘ্রই নতুন দায়িত্ব বন্টনের কথা ঘোষণা হতে পারে।
দলীয় শৃঙ্খলা ও ঐক্যের ওপর জোর
বৈঠকের শেষ অংশে অভিষেক জোর দেন দলের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা ও ঐক্যের ওপর। বিরোধীদের এক ইঞ্চি জমিও ছেড়ে না দেওয়ার বার্তা দেন তিনি। একই সঙ্গে জানান, কোচবিহার হবে উত্তরবঙ্গের রাজনৈতিক লড়াইয়ের কেন্দ্রবিন্দু। এবং এই লড়াইয়ে জিততে হলে দলকে একজোট হয়ে এগোতেই হবে।
কোচবিহারকে ঘিরে তৃণমূল যে এবার বিশেষ কৌশলে চলছে, তা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বৈঠক স্পষ্ট করে দিয়েছে। সীমান্তবর্তী এই জেলায় এনআরসি ও বিভাজনের রাজনীতিকে রুখতে এখন থেকেই রাজনৈতিক প্রস্তুতি নিচ্ছে শাসকদল। আগামী নির্বাচনে এই জেলার ফলাফল যে রাজ্যের দিক নির্ধারণে বড় ভূমিকা নেবে, তা বুঝেই সংগঠনের ঘর গোছাতে তৎপর অভিষেক।








