নজরবন্দি ব্যুরো: ক্যামাক স্ট্রিট-কাণ্ডে মঙ্গলবার শেক্সপিয়র সরণি থানায় প্রায় সাড়ে পাঁচ ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি হলেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক তথা সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় (Abhishek Banerjee)। থানা থেকে বেরিয়ে বিজেপি সরকারকে নিশানা করে তাঁর বিস্ফোরক দাবি, ‘‘মানুষের ভোটে জিতে এলে এত ভয় কিসের? বিজেপি জানে মানুষের ভোটে নির্বাচিত হয়ে আসেনি।’’ পাশাপাশি পুলিশি তৎপরতা নিয়েও সরব হন তিনি।
পুলিশের নোটিস মেনে মঙ্গলবার দুপুর ১২টা ১৭ মিনিট নাগাদ শেক্সপিয়র সরণি থানায় ঢোকেন অভিষেক। দুপুরের পর থেকে তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। সন্ধ্যায় থানা থেকে বেরিয়ে ক্যামাক স্ট্রিটের ঘটনার তদন্ত নিয়ে একাধিক প্রশ্ন তোলেন তিনি।
অভিষেকের দাবি, একটি সাইনবোর্ড নামানোর জন্য প্রায় ১০০০ পুলিশকর্মী মোতায়েন করা হয়েছিল। তাঁর অভিযোগ, এই তৎপরতার উদ্দেশ্য ছিল গণতন্ত্রের কণ্ঠরোধ করা। তবে তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদকারী পুলিশ আধিকারিকদের বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত ভাবে কোনও অভিযোগ করেননি তিনি।
বরং পুলিশকর্মীদের পাশে দাঁড়িয়ে অভিষেক বলেন, তাঁরা তাঁদের কর্তব্যই পালন করছেন। তাঁকে ঠিক কী কী প্রশ্ন করা হয়েছে, সেই বিষয়ে অবশ্য কোনও মন্তব্য করেননি তৃণমূল সাংসদ।
ক্যামাক স্ট্রিটের ঘটনার প্রসঙ্গেই রাজ্যের বিজেপি সরকারকে নিউ মার্কেটের একটি হোটেলে প্রাণহানির ঘটনা নিয়েও কটাক্ষ করেন অভিষেক। তাঁর বক্তব্য, এক মাস আগে যদি এমন তৎপরতা দেখানো হত, তা হলে ওই হোটেলে প্রাণহানি এড়ানো যেত।
এর পাশাপাশি আলিপুরে ইভিএমের কন্ট্রোল ইউনিট পুড়ে যাওয়ার ঘটনাও তুলে ধরেন তিনি। অভিষেকের দাবি, নির্বাচনের ফল ঘোষণার এক মাস পরে আলিপুরে প্রায় ৪০০০ কন্ট্রোল ইউনিট পুড়ে গেলেও তখন ফায়ার অডিট করা হয়নি।
ক্যামাক স্ট্রিটের ঘটনায় অভিষেকদের বিরুদ্ধে মহিলা পুলিশকর্মীদের হেনস্থা ও শ্লীলতাহানির চেষ্টার অভিযোগ রয়েছে। সেই অভিযোগ সরাসরি খারিজ করে অভিষেকের পাল্টা দাবি, তাঁদের দলের ১৩ জন কর্মীকে ‘‘অবৈধ ভাবে’’ গ্রেফতার করা হয়েছে এবং গ্রেফতারের ক্ষেত্রে একাধিক পদ্ধতিগত ত্রুটি রয়েছে।
তাঁর আরও দাবি, ঘটনার দিনের ভিডিয়ো তাঁদের হাতে রয়েছে। সেই ভিডিয়োয় তৃণমূল কর্মীদের সিঁড়ি দিয়ে টেনে-হিঁচড়ে নামানোর দৃশ্য রয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি। তবে তদন্তকারী পুলিশকর্মীদের দায়ী না করে অভিষেক ফের বলেন, তাঁরা নিজেদের দায়িত্ব পালন করছেন।
এর পরেই সরাসরি বিজেপিকে নিশানা করেন তৃণমূল সাংসদ। তাঁর অভিযোগ, ভোটের পর থেকেই তৃণমূলের বিধায়ক, সাংসদ, গ্রামসভা, অ্যাকাউন্ট, সমিতি এবং দলীয় দফতর ভাঙানোর চেষ্টা চলছে। মিথ্যা মামলায় তৃণমূল নেতাকর্মীদের জেলে ভরে দলটিকে শেষ করা যাবে—এমন ভাবনা থাকলে বিজেপি ভুল করছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari)-কে নিয়েও তীব্র আক্রমণ করেন অভিষেক। সারদাকর্তা সুদীপ্ত সেনের (Sudipta Sen) পুরনো অভিযোগের প্রসঙ্গ তুলে তাঁর বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ করেন তিনি। তবে এগুলি অভিষেকের রাজনৈতিক বক্তব্য এবং সংশ্লিষ্ট অভিযোগগুলি প্রমাণিত বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হচ্ছে না।
ক্যামাক স্ট্রিটের ঘটনার সূত্রপাত বৃহস্পতিবার। কলকাতা পুরসভার আধিকারিকেরা অভিষেকের দফতর থেকে একটি বিলবোর্ড খুলতে গেলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়। পুরসভার দাবি, তৃণমূলের নামাঙ্কিত ওই বিলবোর্ডটি অনুমোদনহীন এবং বিপজ্জনক ভাবে ঝুলছিল।
পুর আধিকারিকদের কাজে বাধা দেওয়া এবং তাঁদের সঙ্গে ধস্তাধস্তির অভিযোগ ওঠে অভিষেক ও তাঁর অনুগামীদের বিরুদ্ধে। পুলিশের সহযোগিতায় পুরকর্মীরা দফতরে ঢোকার সময় অশান্তি তৈরি হয়। পরে সরকারি কাজে বাধা, মারধর এবং মহিলা পুলিশকর্মীদের হেনস্থার অভিযোগ-সহ শেক্সপিয়র সরণি থানায় তিনটি এফআইআর দায়ের হয়।
এই মামলাতেই অভিষেক ছাড়াও ডেরেক ও’ব্রায়েন (Derek O’Brien), বৈশ্বানর চট্টোপাধ্যায়, প্রাক্তন বিধায়ক হুমায়ুন কবীর এবং অভিষেকের আপ্তসহায়ক সুমিত রায়কে নোটিস পাঠানো হয়েছিল। ডেরেক ও’ব্রায়েন মঙ্গলবার হাজিরা দেননি। তবে নোটিস মেনে থানায় হাজির হন অভিষেক।
এখন তদন্ত কোন পথে এগোয় এবং ক্যামাক স্ট্রিটের ঘটনায় ওঠা অভিযোগগুলির বিষয়ে পুলিশ কী পদক্ষেপ করে, সেদিকেই নজর। অন্যদিকে, থানায় জিজ্ঞাসাবাদ শেষে অভিষেকের তীব্র রাজনৈতিক আক্রমণ নতুন করে রাজ্যের শাসক ও বিরোধী শিবিরের সংঘাতকে আরও সামনে এনে দিল।



