দুর্গাপুজোয় আমিষ খাবার নিয়ে বাগেশ্বর ধামের ধীরেন্দ্রকৃষ্ণ শাস্ত্রীর মন্তব্যের পর এবার পাল্টা সরব সঞ্জীব সান্যাল। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর অর্থনৈতিক উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য সঞ্জীব সান্যাল সমাজমাধ্যমে শাক্ত হিন্দু ঐতিহ্যে মাংস নিবেদনের প্রসঙ্গ তুলে ধরেছেন। তাঁর বক্তব্য, বাংলার শাক্ত পরম্পরায় আমিষের একটি ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় ভূমিকা রয়েছে।
সম্প্রতি কলকাতায় এসে দুর্গাপুজোর সময় মণ্ডপের আশপাশে আমিষ খাবার বিক্রি না করার আবেদন জানিয়েছিলেন বাগেশ্বর ধামের প্রধান ধীরেন্দ্রকৃষ্ণ শাস্ত্রী। নবরাত্রির সময় বাংলার হিন্দুদের নিরামিষ খাবার গ্রহণেরও আহ্বান জানান তিনি। তাঁর এই মন্তব্যের পরেই দুর্গাপুজোর রীতি, বাঙালির খাদ্যাভ্যাস এবং ধর্মীয় আচারের স্বাধীনতা নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়েছে।
সেই আবহেই সঞ্জীব সান্যালের বক্তব্য সামনে আসে। তাঁর বক্তব্যের মূল সুর, শাক্ত হিন্দুধর্মের সঙ্গে মাংসের সম্পর্ককে উপেক্ষা করা যায় না। দুর্গা ও কালীপুজোয় বিভিন্ন শাক্ত পরম্পরায় আমিষ নিবেদনের রীতি রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। অর্থাৎ, বাংলার ধর্মীয় সংস্কৃতির একটি অংশকে শুধুমাত্র নিরামিষাচারের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে দেখা ঠিক নয়—এমনই মত তাঁর।
তবে বাংলায় দুর্গাপুজোর রীতি একরকম নয়। বহু বাড়ি ও পুজোয় নিরামিষ ভোগের চল রয়েছে। আবার বিভিন্ন শাক্ত পরম্পরায় আমিষ নিবেদন বা মাংস প্রসাদেরও প্রচলন দেখা যায়। ফলে বাঙালি হিন্দুদের জন্য একটি মাত্র খাদ্যরীতিকে সর্বজনীন ধর্মীয় বিধান হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার সুযোগ নেই।
এর আগে এই বিতর্কে মুখ খুলেছেন বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্যও। বাগেশ্বরের বক্তব্যের প্রেক্ষিতে তাঁর স্পষ্ট মন্তব্য, বাঙালির দীর্ঘদিনের খাদ্যাভ্যাস বাইরে থেকে এসে কেউ বদলে দিতে পারেন না। অষ্টমীতে লুচি এবং নবমীতে মাংস খাওয়ার মতো রীতির উল্লেখ করে তিনি বলেন, বাঙালি নিজের পছন্দ অনুযায়ী খাবার বেছে নেবে।
ফলে একই বিষয়ে বিজেপির অন্দরেও ভিন্ন সুর শোনা যাচ্ছে। বাগেশ্বরের নিরামিষের আহ্বানের সঙ্গে একমত না হয়ে শমীক যেমন বাঙালির খাদ্যসংস্কৃতির পক্ষে কথা বলেছেন, তেমনই সঞ্জীব সান্যাল তুলে ধরেছেন শাক্ত ধর্মীয় পরম্পরায় আমিষের উপস্থিতির কথা।
বিতর্কটি শুধু ‘মাছ-মাংস খাওয়া হবে কি না’—এই প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নেই। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বাংলার নিজস্ব ধর্মীয় রীতি, শাক্ত সংস্কৃতি এবং ব্যক্তিগত খাদ্যাভ্যাসের প্রশ্ন। বিশেষ করে দুর্গাপুজোর মতো ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক উৎসবের ক্ষেত্রে কোনও একটি নির্দিষ্ট খাদ্যরীতিকে গোটা বাংলার উপর প্রযোজ্য করার দাবি কতটা গ্রহণযোগ্য, সেটিই এখন আলোচনার অন্যতম বিষয়।
এখনও পর্যন্ত দুর্গাপুজোয় আমিষ খাবার নিয়ে রাজ্য সরকারের কোনও সর্বজনীন নিষেধাজ্ঞার কথা জানা যায়নি। ফলে পুজোর ভোগ বা খাবারের ধরন মূলত সংশ্লিষ্ট পুজো কমিটি ও পরিবারের নিজস্ব রীতি এবং সিদ্ধান্তের বিষয়ই থাকছে।
বাগেশ্বরের মন্তব্যের পর সঞ্জীব সান্যালের পাল্টা বক্তব্য তাই নতুন করে সেই পুরনো প্রশ্ন সামনে এনেছে—বাংলার দুর্গাপুজোর ধর্মীয় রীতি কি এক ছাঁচে বাঁধা যায়, নাকি শাক্ত, বৈষ্ণব ও স্থানীয় নানা পরম্পরার বৈচিত্র্যই এই উৎসবের অন্যতম বৈশিষ্ট্য?



