নজরবন্দি ব্যুরো: রাজনীতি থেকে সরে দাঁড়ানোর পর এবার নিজের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা নিয়ে খোলামেলা চিরঞ্জিত চক্রবর্তী (Chiranjeet Chakraborty)। তৃণমূল কংগ্রেসে (TMC) প্রায় ১৫ বছর থাকার পর কেন সক্রিয় রাজনীতি ছাড়লেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Banerjee) সম্পর্কে এখন কী ভাবেন এবং বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari)-র কাজকর্মকে কীভাবে দেখছেন—সব নিয়েই মুখ খুলেছেন অভিনেতা।
বারাসাতের প্রাক্তন বিধায়কের দাবি, রাজনীতি তাঁর নিজের পছন্দ ছিল না। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনুরোধেই তিনি রাজনীতিতে এসেছিলেন। কিন্তু দীর্ঘদিন রাজনীতির ময়দানে থাকার পর চারপাশের নানা ‘ভুল কাজকর্ম’ দেখে তাঁর মোহভঙ্গ হয়। শেষ পর্যন্ত সক্রিয় রাজনীতি থেকে সরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি।
বারাসাতের প্রসঙ্গ উঠতেই চিরঞ্জিত জানান, ওই এলাকার বহু মানুষের সঙ্গে তাঁর এখনও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। তবে রাজনীতিতে ফেরার কোনও ইচ্ছা তাঁর নেই। এমনকি অতীতে ভোটের সময় নিজের অবস্থান নিয়ে বিরল আবেদনও করেছিলেন বলে জানান অভিনেতা।
তাঁর কথায়, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ফের তাঁকে প্রার্থী করলেও মানুষ যেন তাঁকে ভোট না দেন—এমন অনুরোধও করেছিলেন তিনি। চিরঞ্জিত বলেন, “আমি বোধহয় একমাত্র ইলেকশনে দাঁড়ানো ক্যান্ডিডেট যে টিকিট পেয়েও বলছে আমাকে ভোট দেবেন না।”
রাজনীতিতে আসার পিছনে যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ব্যক্তিগত অনুরোধই বড় কারণ ছিল, সেটিও স্পষ্ট করেছেন চিরঞ্জিত। তাঁর বক্তব্য, “পলিটিক্সের লোক আমি নই। পলিটিক্সে আমি যেতেও চাইনি। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অনেক অনুরোধ করেছিলেন তাই এসেছিলাম।”
তবে রাজনীতি ছাড়ার পরও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতি তাঁর ব্যক্তিগত শ্রদ্ধা পুরোপুরি বদলে যায়নি। বরং তাঁর বক্তব্যে পুরনো সম্পর্কের আবেগ যেমন রয়েছে, তেমনই রয়েছে হতাশাও। চিরঞ্জিতের কথায়, “মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আমার খুবই প্রিয় মানুষ। আমি ওঁর আদর্শ ফ্যান ছিলাম।”
তাঁর মতে, বামফ্রন্টের দীর্ঘ ৩৪ বছরের শাসনের অবসান ঘটিয়ে বাংলায় রাজনৈতিক পরিবর্তন আনার ক্ষমতা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মধ্যেই ছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে পরিস্থিতি বদলেছে বলেই মনে করেন তিনি। তাঁর অভিযোগ, “আস্তে আস্তে ওঁর হাত থেকে কন্ট্রোলটা চলে গিয়েছিল।”
তৃণমূলকে নিয়েও তাঁর অবস্থান বেশ স্পষ্ট। চিরঞ্জিতের মতে, তাঁর কাছে তৃণমূল কংগ্রেস মানেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। মমতাকে বাদ দিয়ে দলের প্রতি আলাদা কোনও রাজনৈতিক আনুগত্য তাঁর নেই। তাঁর কথায়, “ওঁকে ছাড়া তৃণমূল হয় না। আলাদা করে আমার কাছে তৃণমূলের কোনও ভ্যালু নেই।”
তৃণমূলকে ঘিরে তৈরি হওয়া ‘চোর’ তকমা নিয়েও আক্ষেপ প্রকাশ করেছেন প্রাক্তন বিধায়ক। তাঁর বক্তব্য, এই ধরনের পরিচয় শুনতে তাঁর খারাপ লাগে, কারণ একসময় তিনিও ওই দলেরই অংশ ছিলেন। অর্থাৎ দলের সঙ্গে তাঁর বর্তমান দূরত্ব থাকলেও অতীত রাজনৈতিক পরিচয় থেকে তৈরি হওয়া আবেগ এখনও পুরোপুরি মুছে যায়নি।
অন্যদিকে বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীকে নিয়ে চিরঞ্জিতের মন্তব্য তুলনামূলকভাবে ইতিবাচক। নন্দীগ্রাম আন্দোলনের প্রসঙ্গ তুলে তাঁর বক্তব্য, শুভেন্দু বহু রাজনৈতিক লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে বর্তমান জায়গায় পৌঁছেছেন এবং সেই পথচলায় নন্দীগ্রামের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।
শুভেন্দু সরকারের কয়েক মাসের কাজকর্মে কিছু ‘পজিটিভ সাইন’ দেখতে পাচ্ছেন বলেও জানিয়েছেন অভিনেতা। তাঁর আশা, আগামী দিনে রাজ্যের পরিস্থিতি আরও ভালো হবে। তবে সক্রিয় রাজনীতিতে ফেরার বিষয়ে নিজের অবস্থান বদলের কোনও ইঙ্গিত দেননি তিনি।
চিরঞ্জিতের সাম্প্রতিক মন্তব্যে তাই একইসঙ্গে উঠে এসেছে তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতি পুরনো আবেগ, তৃণমূলের বর্তমান ভাবমূর্তি নিয়ে হতাশা এবং শুভেন্দু অধিকারীর প্রশাসন নিয়ে নতুন করে তৈরি হওয়া প্রত্যাশা। রাজনীতি থেকে সরে গেলেও বাংলার রাজনীতির গতিপথ নিয়ে তাঁর আগ্রহ যে এখনও রয়েছে, তাঁর বক্তব্যেই তা স্পষ্ট।



