স্বাধীনতা দিবসে স্বাভাবিকই ছিলেন আশিস, রাত ১২টা পর্যন্ত পরিবারের সঙ্গে আড্ডা, সকালে উদ্ধার দেহ

স্বাধীনতা দিবসে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত স্বাভাবিক ছিলেন আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়। পরিবারের সঙ্গে মধ্যরাত পর্যন্ত গল্পের পর সকালে বাড়ির লাগোয়া দলীয় কার্যালয় থেকে উদ্ধার দেহ।

নজরবন্দি ডিজিটাল ডেস্ক

স্বাধীনতা দিবসের সকাল থেকে রাত পর্যন্ত একেবারেই স্বাভাবিক ছিলেন আশিস বন্দ্যোপাধ্যায় (Ashis Banerjee)—পরিবারের দাবি অন্তত তেমনই। সকালে এলাকায় স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছিলেন, সন্ধ্যায় সময় কাটিয়েছিলেন দলীয় কার্যালয়ে। রাতে বাড়ি ফিরে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে প্রায় মধ্যরাত পর্যন্ত গল্পও করেন। তারপর নিজেই খেতে উঠে ঘরে চলে যান। কয়েক ঘণ্টা পর রবিবার সকালে বাড়ির লাগোয়া দলীয় কার্যালয় থেকে তাঁর ঝুলন্ত দেহ উদ্ধারের ঘটনায় স্তম্ভিত পরিবার ও প্রতিবেশীরা। ঘটনাটি ঘিরে ইতিমধ্যেই তদন্ত শুরু করেছে পুলিশ।

রামপুরহাটের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের হাটতলাপাড়ায় বাড়ি আশিসের। বাড়ির লাগোয়া দলীয় কার্যালয় থেকেই রবিবার সকালে তাঁর দেহ উদ্ধার হয়। পরিবারের সদস্যদের বক্তব্য, ঘরের দরজার ফাঁক দিয়ে দড়ি ঝুলতে দেখে প্রথমে সন্দেহ হয়। পরে দরজা ভেঙে দেহ উদ্ধার করা হয় বলে জানিয়েছেন তাঁর ভাই প্রশান্ত বন্দ্যোপাধ্যায়।

ঘটনার পরই রামপুরহাট থানার পুলিশ সেখানে পৌঁছয়। দেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়েছে। মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এখনও নিশ্চিত নয়। পুলিশ গোটা ঘটনাটি খতিয়ে দেখছে। ঘটনাস্থল থেকে একটি হাতে লেখা চিঠি উদ্ধারের কথাও সামনে এসেছে, যদিও সেই চিঠির সত্যতা, লেখার সময় এবং মৃত্যুর সঙ্গে তার সম্পর্ক তদন্তসাপেক্ষ।

সবচেয়ে বেশি ধাক্কা খেয়েছে পরিবার এই কারণে যে, মৃত্যুর আগের কয়েক ঘণ্টায় আশিসের আচরণে কোনও অস্বাভাবিকতা চোখে পড়েনি। তাঁর ভাই প্রশান্তের বক্তব্য, রাত পর্যন্ত পরিবারের সকলের সঙ্গে স্বাভাবিক ভাবেই গল্প করেছিলেন আশিস। এমন কোনও ইঙ্গিত মেলেনি যে তিনি কোনও গভীর সংকটের মধ্যে রয়েছেন।

পরিবারের সদস্যদের দাবি, শনিবার রাতে প্রায় ১২টা পর্যন্ত একসঙ্গে বসে গল্প করেন তাঁরা। এরপর নিজেই খাবার খেতে ওঠেন এবং নিজের ঘরে চলে যান। দরজা বন্ধ করে দেওয়ার পর আর কোনও অস্বাভাবিক শব্দ বা আচরণ নজরে আসেনি। রবিবার সকালে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ অন্য রকম দেখতে হয় পরিবারের সদস্যদের।

স্বাধীনতা দিবসের দিন সকালেও সক্রিয় ছিলেন আশিস। স্থানীয় বাসিন্দাদের বক্তব্য, এলাকায় পতাকা উত্তোলনের কর্মসূচিতেও অংশ নিয়েছিলেন তিনি। পরে নিজের দলীয় কার্যালয়ে বেশ কিছুক্ষণ বসেছিলেন। স্থানীয়দের সঙ্গে কথাবার্তাও হয়েছিল তাঁর। ফলে মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে এমন ঘটনা কী ভাবে ঘটল, সেটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।

এক স্থানীয় বাসিন্দার কথায়, শনিবার সন্ধ্যাতেও দলীয় কার্যালয়ে আশিসের সঙ্গে দেখা হয়েছিল। ওই এলাকায় প্রায়ই রাতে বসে আড্ডা দেওয়ার চল ছিল। তাঁর আচরণে সেদিনও কোনও বিশেষ পরিবর্তন চোখে পড়েনি বলে দাবি স্থানীয়দের একাংশের।

তবে মৃত্যুর সম্ভাব্য কারণ নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে নানা আলোচনা শুরু হয়েছে। কেউ কেউ মানসিক চাপের কথা বললেও পুলিশ এখনও এমন কোনও কারণকে নিশ্চিত করেনি। সম্প্রতি নির্বাচনী পরাজয়, দলীয় সাংগঠনিক পদ থেকে সরে দাঁড়ানো এবং রাজনৈতিক ভাবে তুলনামূলক নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ার মতো বিষয়গুলি নিয়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনা চলছে। জুনে আশিস বীরভূম জেলা তৃণমূলের চেয়ারম্যান এবং জেলা কোর কমিটির চেয়ারম্যান পদ থেকে ইস্তফা দিয়েছিলেন।

২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনেও দীর্ঘ রাজনৈতিক সাফল্যে ছেদ পড়ে আশিসের। রামপুরহাট আসনে বিজেপির ধ্রুব সাহার কাছে পরাজিত হন তিনি। ২০০১ সাল থেকে টানা পাঁচবার রামপুরহাটের বিধায়ক ছিলেন আশিস। এবারের নির্বাচনে ধ্রুব সাহা জয়ী হন এবং আশিস দ্বিতীয় স্থানে ছিলেন।

তবে পরিবারের বক্তব্য এবং স্থানীয়দের অনুমানকে মৃত্যুর কারণ হিসেবে ধরে নেওয়ার কোনও সুযোগ নেই। আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়ের মৃত্যু আত্মহত্যা নাকি অন্য কোনও কারণে ঘটেছে, তা এখনও তদন্তের বিষয়। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট, ঘটনাস্থলের ফরেন্সিক তথ্য এবং পুলিশি তদন্তের ফলাফলের উপরই নির্ভর করবে পরবর্তী ছবি।

স্বাধীনতা দিবসের সকালে যিনি স্বাভাবিক ভাবে কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছিলেন, সন্ধ্যায় দলীয় কার্যালয়ে বসেছিলেন এবং রাতেও পরিবারের সঙ্গে গল্প করেছিলেন, তাঁর পরদিন সকালে মৃত্যু তাই পরিবার ও গোটা রামপুরহাটের কাছেই গভীর ধাক্কা। আপাতত উত্তরহীন একাধিক প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে পুলিশ।

সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে

Google News Google News এবং Google Discover Google Discover -এ নজরবন্দি-কে Follow করে রাখুন।

আরও পড়ুন