পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে নজিরবিহীন পরিস্থিতি। বিধানসভায় নতুন পরিষদীয় ব্লক গঠনের দাবি তুলে বিরোধী দলনেতা হিসেবে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কে মনোনীত করার পর এবার নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান স্পষ্ট করলেন বিদ্রোহী তৃণমূল বিধায়কেরা। তাঁদের দাবি, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ই তাঁদের নেত্রী থাকবেন। তবে বিধানসভার এই নতুন পরিষদীয় দলের সঙ্গে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কোনও সম্পর্ক নেই।
বুধবার বিধানসভায় সাংবাদিক বৈঠকে নতুন পরিষদীয় দলের নেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তাঁর সহকর্মীরা জানান, তাঁরা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে রাজনৈতিক মেন্টর বা প্রধান পরামর্শদাতা হিসেবেই দেখতে চান। দলীয় আদর্শ এবং নেতৃত্বের প্রশ্নে তাঁদের কোনও দ্বিধা নেই বলেও দাবি করা হয়।
রঘুনাথগঞ্জের বিধায়ক ও প্রাক্তন মন্ত্রী আখরুজ্জামান বলেন, “আমাদের নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এই বিষয়ে কোনও সংশয় নেই। তাঁর পরামর্শেই আমরা প্রধান বিরোধী দল হিসেবে কাজ করতে চাই।” তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট, বিদ্রোহী শিবির নিজেদের মমতা-বিরোধী হিসেবে তুলে ধরতে চাইছে না।
অন্যদিকে, ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় আরও একধাপ এগিয়ে বলেন, “বিধানসভার এই পরিষদীয় দলের সঙ্গে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের দূর-দূরান্ত পর্যন্ত কোনও সম্পর্ক নেই।” এই মন্তব্য ঘিরেই নতুন রাজনৈতিক বিতর্ক শুরু হয়েছে।
বিধানসভার বিরোধী দলনেতা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে যে সই-বিতর্কের সূত্রপাত হয়েছিল, সেটিকেই বর্তমান পরিস্থিতির মূল কারণ হিসেবে তুলে ধরছে নতুন শিবির। তাদের দাবি, পরিষদীয় দলনেতা নির্বাচনের প্রক্রিয়া যথাযথভাবে হয়নি এবং সেই কারণেই দলীয় ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে ৫৮ জন বিধায়কের সমর্থন নিয়ে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কে বিরোধী দলনেতা হিসেবে মনোনীত করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। সেই সংক্রান্ত চিঠিও বিধানসভার অধ্যক্ষের কাছে জমা দেওয়া হয়েছে।
নতুন পরিষদীয় দলের কাঠামোও ঘোষণা করা হয়েছে। আখরুজ্জামানকে মুখ্যসচেতক (Chief Whip) করা হয়েছে। পাশাপাশি জাভেদ আহমেদ খান, সাবিনা ইয়াসমিন, শিউলি সাহা এবং সন্দীপন সাহাকে উপ-দলনেতার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।
ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, তাঁদের লক্ষ্য দায়িত্বশীল ও গঠনমূলক বিরোধী রাজনীতি করা। সরকারের ইতিবাচক পদক্ষেপকে সমর্থন করার পাশাপাশি প্রয়োজন হলে কঠোর বিরোধিতাও করা হবে। তাঁর দাবি, জনগণ তাঁদের বিরোধী আসনে বসার দায়িত্ব দিয়েছে, তাই সেই দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করাই তাঁদের লক্ষ্য।
প্রসঙ্গত, বিধানসভার সই-বিতর্ক এবং তথাকথিত জাল স্বাক্ষর অভিযোগ সামনে আসার পর থেকেই তৃণমূলের অন্দরে অস্থিরতা বাড়তে শুরু করে। অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত শুরু করেছে CID। ইতিমধ্যেই একাধিক বিধায়কের সঙ্গে কথা বলেছেন তদন্তকারীরা।
এদিকে, বিদ্রোহী শিবির যখন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে পরামর্শদাতা হিসেবে রাখার প্রস্তাব সামনে আনছে, ঠিক সেই সময় কালীঘাটে দলের শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে বৈঠকে বসেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ফলে আগামী দিনে তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি কোন দিকে মোড় নেয়, সেদিকেই এখন নজর রাজনৈতিক মহলের।
নতুন পরিষদীয় দলের এই অবস্থান একদিকে যেমন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বকে স্বীকৃতি দিচ্ছে, অন্যদিকে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভূমিকা নিয়ে সরাসরি প্রশ্ন তুলে রাজনৈতিক সংঘাতকে আরও তীব্র করে তুলেছে।



