নন্দীগ্রামে ‘সেবাশ্রয়’ হবে প্রতি বছর, সাহস থাকলে আটকান! শুভেন্দুকে চ্যালেঞ্জ অভিষেকের

নন্দীগ্রামে স্বাস্থ্যশিবির ‘সেবাশ্রয়’ নিয়ে শুভেন্দুকে চ্যালেঞ্জ অভিষেকের। প্রতি বছর শিবির হবে ঘোষণা, সঙ্গে তৃণমূলের গোষ্ঠীকোন্দল সামলানোর বার্তা।

নজরবন্দি ডিজিটাল ডেস্ক

নন্দীগ্রামের মাটি বরাবরই রাজনীতির উত্তাপ বোঝে—আর সেই উত্তাপের মাঝেই এবার স্বাস্থ্য পরিষেবাকে হাতিয়ার করে বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর বিরুদ্ধে সরাসরি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিলেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় নন্দীগ্রামের দুই ব্লকে শুরু হওয়া স্বাস্থ্য শিবির ‘সেবাশ্রয়’ ঘুরে ঘোষণা করলেন—এটা শুধু চলতি বছরের কর্মসূচি নয়, প্রতি বছরই নন্দীগ্রামে ‘সেবাশ্রয়’ হবে। এমনকি আগামী দিনে ১৭টি অঞ্চল জুড়ে এই শিবির ছড়িয়ে দেওয়ার বার্তাও দিলেন তিনি। সঙ্গে হুঁশিয়ারি—“ক্ষমতা থাকলে আটকান!”

দিনভর নন্দীগ্রামে ছবিটা যেন স্পষ্ট—এখানে তৃণমূলের প্রধান প্রতিপক্ষ বিজেপি দল নয়, এক ব্যক্তি: শুভেন্দু অধিকারী। বুঝেশুনেই অভিষেকের নিশানাও ছিল ঠিক সেদিকেই। কটাক্ষের সুরে তিনি মন্তব্য করেন, ভবিষ্যতে শুভেন্দুর পরিবারের লোকজনকেও ‘সেবাশ্রয়’-এর পরিষেবা নিতে হতে পারে—ইঙ্গিতটা ছিল রাজনৈতিক বার্তায় মোড়া, কিন্তু আঘাতটা ছিল একেবারে ব্যক্তিগত লক্ষ্যভেদী।

শিবিরের দাবি, বিরোধিতার জবাব: ‘হিসাব দেব ইনকাম ট্যাক্সকে’

তৃণমূল সূত্রে জানা যাচ্ছে, গত অক্টোবর থেকেই ‘এক ডাকে অভিষেক’ নম্বরে নন্দীগ্রামে ‘সেবাশ্রয়’ শিবির করার অনুরোধ আসছিল। সেখান থেকেই এই কর্মসূচি ধাপে ধাপে প্রস্তুত হয়। জানুয়ারির শুরুতেই খবর মিলেছিল, চলতি মাসেই নন্দীগ্রামে এই স্বাস্থ্য শিবির শুরু হতে পারে। আনুষ্ঠানিক ঘোষণা হতেই শুভেন্দুর তরফে একাধিক মন্তব্য সামনে আসে—এমনকি হিন্দুদের উদ্দেশে বার্তাও ছিল, যেন তারা “তৃণমূলের ট্যাবলেট” না খায়।

কিন্তু বৃহস্পতিবারের শিবিরে দেখা গেল অন্য ছবি। ধর্ম-সম্প্রদায় নির্বিশেষে সাধারণ মানুষ চিকিৎসা পরিষেবা নিতে এসেছেন। যদিও ডায়মন্ড হারবারের মতো বিশাল পরিসরে না হলেও নন্দীগ্রামের এই দুই শিবিরও কম খরচসাপেক্ষ নয়। শিবির চলবে ৩০ জানুয়ারি পর্যন্ত। সেই খরচের উৎস নিয়েই প্রশ্ন তুলেছেন শুভেন্দু।

এর জবাবে অভিষেকের পাল্টা আক্রমণ আরও তীব্র। তিনি বলেন, “উনি হিসাব চাওয়ার কে? হিসাব ইনকাম ট্যাক্সকে দেব। কেন্দ্রীয় এজেন্সি চাইলে তাদের দেব। ওঁর নামের পিছনে ‘অধিকারী’ আছে বলেই যে কোনও অধিকার গজিয়ে যায় না!”

নন্দীগ্রামে বিজেপি বনাম তৃণমূল নয়, শুভেন্দু বনাম অভিষেকের লড়াই?

নন্দীগ্রাম মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক উত্থানের অন্যতম ‘সিঁড়ি’। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে এখানকার তৃণমূল সংগঠন গোষ্ঠীকোন্দলে জর্জরিত। বহুবার সমাধানের চেষ্টা হলেও তা পুরোপুরি সারেনি। বৃহস্পতিবারের আয়োজনেও সেই কোন্দলের ছায়া স্পষ্ট।

দুই ব্লকের শিবির পরিচালনার দায়িত্বে ছিল দু’জন আলাদা প্রতিনিধি—

  • নন্দীগ্রাম ১ নম্বর ব্লক: মুখপাত্র ঋজু দত্ত

  • নন্দীগ্রাম ২ নম্বর ব্লক: কলকাতা পুরসভার কাউন্সিলর সুশান্ত ঘোষ

দুই জনেই দায়িত্ব সামলাতে মরিয়া পরিশ্রম করেছেন। কিন্তু সাংগঠনিক জমায়েত, সমন্বয়, স্বেচ্ছাসেবকদের উপস্থিতি—সব মিলিয়ে ১ নম্বর ব্লক ২ নম্বরের থেকে এগিয়ে ছিল। ঘটনাচক্রে, ওই ব্লকে সংখ্যালঘু জনসংখ্যাও বেশি, যা তৃণমূলের জনসমর্থনের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।

এই দুই শিবির উদ্বোধন করেন ১৯ জন শহিদ পরিবারের সদস্য—এক সময় যাঁদের মধ্যে শুভেন্দুর প্রভাব রয়েছে বলেই কথিত। কিন্তু বৃহস্পতিবার তাঁদের অনেককেই দেখা গেল মমতার আবেগে ভেসে যেতে। শেখ ইয়াসিনের স্ত্রী কাঁদতে কাঁদতে বলে দেন, “দিদি ছাড়া নন্দীগ্রামের আন্দোলন সফল হত না। আমরা দিদিকেই চিনি।”

অন্যদিকে শহিদ জয়দেব দাসের ভ্রাতৃবধূ উপস্থিত থাকলেও রাজনৈতিক অবস্থান স্পষ্ট করতে চাননি। এমনকি নিজের নাম বলতেও অনীহা দেখান। এখানেই নন্দীগ্রামের ‘বাস্তব রাজনীতি’ ধরা পড়ে—এটা শুধু দল নয়, এটা সম্পর্ক, স্মৃতি, আবেগ আর হিসাবের অদ্ভুত সমীকরণ।

বৃহস্পতিবার নন্দীগ্রামে হাজির ছিলেন পূর্ব মেদিনীপুরের তৃণমূলের প্রায় সব পরিচিত মুখ। মন্ত্রী বিপ্লব রায়চৌধুরী থেকে শুরু করে বিধায়ক সোহম চক্রবর্তী, তমলুকের নেতা পীযূষ পণ্ডা, জেলা পরিষদের সভাধিপতি উত্তম বারিক—সবাই ঘুরেছেন শিবিরে।

তবে অস্বস্তিকর ঘটনাও সামনে আসে। একাধিক নেতা-নেত্রী শিবিরে ঢুকতেই বাধার মুখে পড়েন। কেউ ২ নম্বর ব্লকে আটকিয়ে ১ নম্বরে যান, কেউ আবার উল্টোটা করেন। এমন এক রাজ্যস্তরের পরিচিত নেত্রীকে ঘিরেও গুঞ্জন চলেছে, যিনি নিজের কাজের জন্য প্রশংসিত বলে পরিচিত। অর্থাৎ ‘সেবাশ্রয়’ যতটা পরিষেবা, তার চেয়েও বেশি এটা এখন সংগঠন বোঝার মিটার

সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে

Google News Google News এবং Google Discover Google Discover -এ নজরবন্দি-কে Follow করে রাখুন।

আরও পড়ুন