ছুটি চাইতেই বাবার দেহরক্ষীকে বেধড়ক মার, গ্রেফতার হুমায়ুন-পুত্র! থানায় গিয়ে সুর বদলালেন বিধায়ক

নিরাপত্তারক্ষীর ছুটি চাওয়াকে ঘিরে মারধরের অভিযোগে গ্রেফতার বিধায়ক-পুত্র, থানায় গিয়ে ‘শান্তিপূর্ণ আলোচনা’র দাবি হুমায়ুন কবীরের

নজরবন্দি ডিজিটাল ডেস্ক

রবিবার সকালটা ছিল উত্তেজনায় ঠাসা, আর সন্ধ্যা নামতেই সেই উত্তাপ ছড়িয়ে পড়ে গোটা মুর্শিদাবাদের রাজনীতিতে। নিজের নিরাপত্তারক্ষীর ছুটি চাওয়াকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া বচসা পৌঁছয় মারধর, গ্রেফতার এবং থানা-দরবার পর্যন্ত। পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছয় যে নতুন দল গড়া নিয়ে ব্যস্ত থাকার কথা থাকলেও সব কর্মসূচি বাতিল করে ছেলেকে ছাড়াতে থানায় হাজির হতে হয় ভরতপুরের বিধায়ক হুমায়ুন কবীর–কে। সকালবেলা যে বিধায়ক পুলিশকে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছিলেন, বহরমপুর স্তব্ধ করে দেবেন, সন্ধ্যায় থানার গেট থেকে বেরিয়ে তিনিই জানালেন— “শান্তিপূর্ণ আলোচনা হয়েছে।”

কী থেকে শুরু হল বিতর্ক

হুমায়ুন কবীরের ঘনিষ্ঠ সূত্রের দাবি, রবিবার সকালে নিজের বাড়ির অফিসঘরে বিভিন্ন জেলা থেকে আসা নেতাদের সঙ্গে সদ্য গঠিত জনতা উন্নয়ন পার্টির সংগঠন নিয়ে আলোচনা করছিলেন বিধায়ক। সেই সময় তাঁর নিরাপত্তায় থাকা তিন পুলিশকর্মীর মধ্যে এক জন— কনস্টেবল জুম্মা খান— অফিসঘরে ঢুকে ছুটির আবেদন জানান। ব্যক্তিগত কাজের কথা বলে ছুটি চাইলেও তাৎক্ষণিক ভাবে সেই আবেদন নাকচ করা হয় বলে অভিযোগ।

এর পরেও ছুটির দাবিতে অনড় থাকায় কথাকাটাকাটি শুরু হয়। চিৎকার-চেঁচামেচিতে পরিস্থিতি দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।

বাবার অফিসে ঢুকে পড়েন বিধায়ক-পুত্র

হট্টগোলের শব্দ শুনে পাশের ঘর থেকে ছুটে আসেন হুমায়ুনের পুত্র, বেলডাঙা–২ পঞ্চায়েত সমিতির পূর্ত কর্মাধ্যক্ষ গোলাম। এখান থেকেই পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে।
হুমায়ুন কবীরের দাবি, নিরাপত্তারক্ষী তাঁদের উপর আক্রমণ করেন। অন্য দিকে, কনস্টেবল জুম্মা খানের অভিযোগ, বিধায়কের ছেলে তাঁর গায়ে হাত তুলেছেন। বিষয়টি সঙ্গে সঙ্গে ফোনে শক্তিপুর থানায় জানানো হয় এবং পরে থানায় গিয়ে লিখিত অভিযোগও দায়ের করা হয়।

বাড়ি ঘিরে পুলিশ, গ্রেফতার বিধায়ক-পুত্র

ঘটনার কিছুক্ষণের মধ্যেই মধ্যাহ্নভোজ সেরে বহরমপুরের দিকে রওনা দেন হুমায়ুন। সেখানেই আসে ফোন— পুত্রবধূ জানান, পুলিশ বাড়ি ঘিরে ফেলেছে এবং গোলামকে থানায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে। খবর পেয়েই সমস্ত কর্মসূচি বাতিল করে প্রায় ৫০ জন অনুগামীকে সঙ্গে নিয়ে শক্তিপুর থানার উদ্দেশে রওনা দেন বিধায়ক। পথে ঘোষণা করেন, “বৃহস্পতিবার পুলিশ সুপারের অফিস ঘেরাও করা হবে।”

থানায় মুখোমুখি জিজ্ঞাসাবাদ

থানায় পৌঁছে দেখা যায়, শক্তিপুর ও হরিহরপাড়া থানার আধিকারিকেরা গোলামকে জিজ্ঞাসাবাদ করছেন। পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, হুমায়ুন কবীর, তাঁর পুত্র এবং নিরাপত্তারক্ষী— তিন জনকে মুখোমুখি বসিয়ে জেরা করা হয়। নিজেদের নির্দোষ প্রমাণে বাড়ির সিসিটিভি ফুটেজের উল্লেখ করেন বিধায়ক ও তাঁর ছেলে। ওই ফুটেজ আগেই পুলিশ সংগ্রহ করেছিল।

প্রায় এক ঘণ্টা পুলিশের সঙ্গে আলোচনা চলে। থানার বাইরে বেরিয়ে হুমায়ুন কবীর বলেন, “জেলা পুলিশের আধিকারিকদের সঙ্গে সুস্থ ও সুষ্ঠু আলোচনা হয়েছে। দুই আইসি ও এসডিপিও–র সঙ্গে কথা বলে আমি সন্তুষ্ট।” তিনি জানান, আইনজীবী এসে জামিনে পুত্রকে ছাড়িয়ে নিয়ে যাবেন।

বাবার বিরুদ্ধেও মামলা, তবে জামিনযোগ্য ধারা

পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, শুধু গোলামের বিরুদ্ধেই নয়, নিরাপত্তারক্ষীকে হেনস্থার অভিযোগে হুমায়ুন কবীরের বিরুদ্ধেও মামলা রুজু হয়েছে। যদিও দুই ক্ষেত্রেই জামিনযোগ্য ধারা প্রয়োগ করা হয়েছে।

রাজনৈতিক মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া

ঘটনাটি ঘিরে দিনভর মুর্শিদাবাদের রাজনৈতিক মহলে চর্চা চলেছে। কংগ্রেস নেতা অধীর চৌধুরী প্রশ্ন তুলেছেন পুলিশের ভূমিকা নিয়ে। তাঁর বক্তব্য, “একজন জনপ্রতিনিধির ছেলেকে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া, আবার জামিনযোগ্য ধারায় বিষয় মিটিয়ে ফেলা— সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে কি এমন হত?”

বিজেপি বিধায়ক গৌরীশঙ্কর ঘোষ বলেন, “তৃণমূল আর হুমায়ুনের গটআপ গেম চলছে। পরিকল্পিত ভাবে তাঁকে প্রচারের আলোয় রাখা হচ্ছে।”

এই অভিযোগ উড়িয়ে দিয়েছে শাসকদল। তৃণমূলের জেলা সভাপতি ও কান্দির বিধায়ক অপূর্ব সরকার বলেন, “বিষয়টি বিচারাধীন। একজন পুলিশকর্মী অভিযোগ করেছেন। আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা হবে। এর সঙ্গে দলের কোনও সম্পর্ক নেই।”

সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে

Google News Google News এবং Google Discover Google Discover -এ নজরবন্দি-কে Follow করে রাখুন।

আরও পড়ুন