নজরবন্দি ব্যুরো: লোকসভার আগে সময় নেই একবছরেরও। আর তার মধ্যেই বসিরহাটের তৃণমূল সাংসদ তথা অভিনেত্রীর বিরুদ্ধে চাঞ্চল্যকর অভিযোগ সামনে এল। তিনি নাকি ২৪ কোটি টাকার প্রতারণার সঙ্গে যুক্ত। যদিও এই অভিযোগ এখনও প্রমাণসাপেক্ষ। আক্ষেপের বিষয়, তৃণমূল আর দুর্নীতি এই শব্দদুটো যেন ক্রমেই পরিপূরক হয়ে উঠছে। এবার, রাজনৈতিক মহলে গুঞ্জন, অভিযোগ প্রমাণ হলে লোকসভার টিকিট কার্যত অনিশ্চিত নুসরতের।
আরও পড়ুন: জাতীয় শিক্ষানীতির বিপরীতেই রাজ্যের অবস্থান, বিধানসভায় স্পষ্ট করলেন ব্রাত্য


পার্থ চট্টোপাধ্যায় থেকে অনুব্রত মণ্ডল, যখনই একের পর এক হেভিওয়েট নেতাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ সামনে এসেছে বা তাঁরা গ্রেফতার হয়েছেন, একটা সময়ের পর কিন্তু দায় ঝেড়ে ফেলেছে তৃণমূল। পার্থকে বহিস্কার করা হয়েছে, আর অনুব্রতকে সরাসরি বহিষ্কার না করেও বীরভূমের দায়িত্ব কাজল শেখের হাতে তুলে দিয়ে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে আর কোনও দিন দলের দরজা খুলবে না। কারণ, শাসক দল হিসেবে, কিংবা আগামী দিনেও ক্ষমতাকে বজায় রাখতে দলকেই প্রাধান্য দেওয়াটাই স্বাভাবিক, কোনও নেতা বা নেত্রী সেখানে তুচ্ছ। সেরকমই নুসরতের ক্ষেত্রেও হবে না তো?
এবারেও হয়তো তৃণমূল নেতারা বলবেন, তাঁরা ‘কেউ’ নুসরতের ‘কাণ্ডকারখানা’ সম্পর্কে অবগত ছিলেন না, যা করেছেন নুসরত ‘একা’ করেছেন, আর নুসরতকে দল থেকে ‘বহিষ্কার’ করে নিজেদের স্ট্যান্ড পয়েন্টকেও মজবুত করতে চাইবে তৃণমূল, যে এই দ্যাখো দুর্নীতিতে যুক্ত নেতা/নেত্রীকে আমরা বহিষ্কার করে কত পুণ্যের কাজ করলাম! বিগত সময়েও দুর্নীতিগ্রস্ত নেতাদের ক্ষেত্রেও এভাবেই পরিকল্পনা সাজিয়েছে শাসক দল।



আচ্ছা, নুসরতের বিরুদ্ধে অভিযোগটা ঠিক কী? তিনি নাকি ২০১৪ সালে ৪২৯ জনের কাছ থেকে ৫ লক্ষ ৫৫ হাজার টাকা করে নেয়। বিজেপি নেতা শঙ্কু দেব পান্ডার বয়ানে, গড়িয়াহাট রোডে ‘মেসার্স সেভেন সেন্স ইনফাস্ট ট্রাকচার প্রাইভেট লিমিটেড’ নামে একটি কোম্পানি আছে। সেই কোম্পানির ডিরেক্টর তৃণমূল সাংসদ নুসরত জাহান। আর এই সংস্থার মাধ্যমেই ২৪ কোটি টাকা তুলে আত্মসাৎ করেছেন নুসরত বলে অভিযোগ। কোটি খানেক টাকার ওপর খরচ করে দুর্নীতির টাকায় ফ্ল্যাট কিনেছেন তিনি।

শঙ্কু আরও বলেছেন, প্রায় ৯ বছর কেটে যাওয়ার পর আজও ফ্ল্যাট পাওয়া যায়নি। সেই সময় নাকি নুসরতের সংস্থা দাবি করেছিল, রাজারহাট হিডকোর কাছে ফ্ল্যাট দেওয়া হবে এই ৪২৯ জনকে। তিন বছরের মধ্যেই ফ্ল্যাটগুলি হস্তান্তরের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। এরপর আদালতের দ্বারস্থ হন। পরে আদালতের নির্দেশেই পুলিশ তদন্ত শুরু করে।

বসিরহাটের সাংসদ হলেও নুসরতকে খুব বেশি সেই এলাকায় দেখা যায় না। সম্প্রতি পঞ্চায়েত ভোটের প্রচারে গিয়েছিলেন কিন্তু তাও সে এক আধবার। দিল্লিতে সংসদেও তিনি নিয়মিতভাবে অনুপস্থিত। করোনাকালেও নিজের নির্বাচনী এলাকার মানুষদের চেয়ে ইন্সটাগ্রাম রিল বানানোকে বেশি ‘গুরুত্বপূর্ণ’ বলে মনে করে দলের কুনজরে আসেন তিনি। ফলে আসন্ন লোকসভা নির্বাচনে তাঁর টিকিট পাওয়া নিয়ে এমনিতেই সংশয় ছিল আর এবার সেই সংশয় বাস্তবায়িত হওয়া কেবল সময়ের অপেক্ষা বলেই রাজনৈতিক মহলের একাংশের ধারণা।

অন্যদিকে, বিজেপি যেভাবে পাল্লা দিয়ে রাজনীতি করছে সেখানে নুসরতের মতো ‘রাজনীতিবিমুখ’ নেত্রী তৃণমূলের জন্যই সত্যিই বিড়ম্বনা। তা শাসক দলের অন্দরে কান পাতলেই শোনা যায়। তাই এবার নুসরতের বিরুদ্ধে প্রতারণার অভিযোগ প্রমাণ হলে কী হতে পারে তার আঁচ করা খুব কঠিন কাজ নয়। আর তাঁকে তো রাজনীতির সক্রিয় লোক বলে গণ্যও করা হয় না। তিনি জিতেছেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দৌলতে আর বসিরহাট এলাকায় নুসরতের ‘মুখ’ কাজে লাগিয়ে লোকসভায় নিজেদের আসন সংখ্যাও বাড়িয়ে নিয়েছে তৃণমূল, একথা অতি বড়ো তৃণমূলীও মানেন হয়তো।

কিন্তু এই যে কোটি কোটি টাকার দুর্নীতির ‘গল্প’ মানুষ প্রতি মাসে শুনছে, তা কি সত্যিই আর ভালো লাগছে? আবার, দুর্নীতি হয়ে থাকলে তা প্রকাশ্যে নিয়ে এসে প্রমাণ হওয়াও প্রয়োজন। যদিও নুসরতের বিরুদ্ধে অভিযোগ এখনও অপ্রমাণিত। তবে, তৃণমূল দুর্নীতি আর ইডি- এই এখন শব্দগুলো হ্যাশট্যাগের চেয়েও জনপ্রিয়, এটা আক্ষেপের না বেদনার? উত্তর চায় মানুষ…
অভিযোগ প্রমাণ হলে লোকসভার টিকিট কার্যত অনিশ্চিত, ভাবমূর্তি ফেরাতে নুসরতকে ছাঁটবে তৃণমূল?








