ধূমপান করলেও সবার ক্যানসার হয় না কেন? কারও ঝুঁকি বেশি, কারও কম—গবেষণায় উঠে এল গুরুত্বপূর্ণ কারণ

কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় উঠে এসেছে, ধূমপান ক্যানসারের বড় ঝুঁকির কারণ হলেও জিনগত বৈশিষ্ট্য নির্ধারণ করতে পারে কার ঝুঁকি কতটা।

নজরবন্দি ডিজিটাল ডেস্ক

ধূমপান (Smoking) যে ক্যানসারের অন্যতম বড় ঝুঁকির কারণ, সে বিষয়ে চিকিৎসাবিজ্ঞান একমত। তবুও একটি প্রশ্ন বহুদিন ধরেই ঘুরে বেড়ায়—বহু বছর ধরে ধূমপান করেও কেন অনেকের ক্যানসার হয় না, আবার কেউ ধূমপান না করেও ফুসফুসের ক্যানসারে আক্রান্ত হন?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই গবেষণা চালিয়েছেন কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের (University of Cambridge) বিজ্ঞানীরা। তাঁদের গবেষণার ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী Nature-এ। গবেষণায় উঠে এসেছে, ধূমপান অবশ্যই ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ায়, কিন্তু সবার শরীর একইভাবে প্রতিক্রিয়া দেখায় না। এর পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে জিন (Genes) এবং ডিএনএ (DNA)-র গঠন।

ধূমপান একমাত্র কারণ নয়

বিশেষজ্ঞদের মতে, ক্যানসার হওয়ার জন্য শুধু ধূমপানই দায়ী নয়। বংশগত জিন, পরিবেশ, খাদ্যাভ্যাস এবং জীবনযাত্রার ধরন—সব মিলিয়েই একজন মানুষের ঝুঁকি নির্ধারিত হয়।

সিগারেট বা তামাকজাত দ্রব্যে থাকা ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ শরীরের ডিএনএ-তে ক্ষতি করতে পারে। কিন্তু সেই ক্ষতি সবার ক্ষেত্রে একইভাবে ক্যানসারে পরিণত হয় না। অনেকের শরীরে ডিএনএ সেই ক্ষতি মেরামত করতে সক্ষম হয়, আবার কারও ক্ষেত্রে জিনে স্থায়ী পরিবর্তন (Mutation) তৈরি হয়, যা পরবর্তীতে ক্যানসারের সূচনা করতে পারে।

জিনের পরিবর্তনই বড় ভূমিকা নিতে পারে

গবেষকদের মতে, শরীরের প্রতিটি কোষের কার্যকলাপ নিয়ন্ত্রণ করে ডিএনএ। ধূমপান, অতিবেগুনি রশ্মি (UV Rays), মদ্যপান, প্রক্রিয়াজাত খাবার বা বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থ ডিএনএ-তে ক্ষত সৃষ্টি করতে পারে।

যদি সেই ক্ষতির ফলে গুরুত্বপূর্ণ জিনে স্থায়ী পরিবর্তন ঘটে, তাহলে কোষের স্বাভাবিক বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা নষ্ট হতে পারে। এর ফলেই শুরু হয় অস্বাভাবিক কোষ বিভাজন, যা পরে ক্যানসারে রূপ নিতে পারে।

অন্যদিকে, যদি ওই গুরুত্বপূর্ণ জিনগুলিতে এমন পরিবর্তন না ঘটে, তাহলে দীর্ঘদিন ধূমপান করলেও ক্যানসার নাও হতে পারে। তবে এর অর্থ এই নয় যে ধূমপান নিরাপদ।

কোন জিনগুলির ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ?

আগের গবেষণাগুলিতে BRCA1 এবং TP53-এর মতো কিছু জিনের পরিবর্তনের সঙ্গে ক্যানসারের সম্পর্ক পাওয়া গিয়েছিল। নতুন গবেষণায় দেখা গিয়েছে, শুধু এই দুটি নয়, আরও একাধিক বংশগত জিনের পরিবর্তন ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

তামাকে থাকা বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থ এই জিনগুলিতে পরিবর্তন ঘটানোর সম্ভাবনা বাড়িয়ে দেয়।

ইঁদুরের উপর পরীক্ষায় কী দেখা গেল?

গবেষকরা মানুষের মতো জিনগত বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন চার ধরনের পরীক্ষামূলক ইঁদুর ব্যবহার করেন।

এরপর নির্দিষ্ট মাত্রায় ডাই-ইথাইলনাইট্রোসামাইন (Diethylnitrosamine বা DEN) নামের একটি রাসায়নিক প্রয়োগ করা হয়, যা তামাকের ধোঁয়া এবং কিছু প্রক্রিয়াজাত খাবারে পাওয়া যায় এবং লিভার ও ফুসফুসের ডিএনএ-র ক্ষতি করতে পারে।

পরীক্ষায় দেখা যায়—

  • একই পরিবেশে থাকা সব ইঁদুরের ক্যানসার হয়নি।
  • যাদের ক্যানসার হয়েছে, তাদের শরীরে নির্দিষ্ট কিছু জিনে মিউটেশন দেখা গেছে।
  • যাদের হয়নি, তাদের ওই জিনগুলি অপরিবর্তিত ছিল।

এই ফলাফল ইঙ্গিত দেয় যে, জিনগত বৈশিষ্ট্য ক্যানসারের ঝুঁকিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

তাহলে কি ধূমপান নিরাপদ?

একেবারেই নয়।

গবেষকরা স্পষ্ট জানিয়েছেন, জিনগত কারণে কারও ঝুঁকি তুলনামূলক কম হতে পারে, কিন্তু ধূমপান কখনও নিরাপদ নয়। কারণ ধূমপান শুধু ক্যানসার নয়, হৃদ্‌রোগ, স্ট্রোক, সিওপিডি (COPD), ফুসফুসের দীর্ঘস্থায়ী রোগ এবং আরও বহু গুরুতর অসুস্থতার ঝুঁকি বাড়ায়।

তাছাড়া, আগে থেকে বোঝা সম্ভব নয় কার শরীরে কখন জিনগত পরিবর্তন শুরু হবে। তাই ক্যানসার প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায়গুলির একটি হল তামাক ও ধূমপান সম্পূর্ণভাবে এড়িয়ে চলা।

সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে

Google News Google News এবং Google Discover Google Discover -এ নজরবন্দি-কে Follow করে রাখুন।

আরও পড়ুন