মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের আগুন জ্বলছে, কিন্তু ইরানের পাশে প্রকাশ্যে অস্ত্র হাতে দাঁড়ায়নি অধিকাংশ মুসলিম দেশ। আমেরিকা–ইজরায়েলের যৌথ অভিযানের পর তেহরান কার্যত একঘরে—এমন ধারণাই তৈরি হয়েছে আন্তর্জাতিক মহলে। প্রশ্ন উঠছে, ইসলামি সংহতির কথা বললেও কেন বাস্তবে ইরানকে সামরিক বা কূটনৈতিক সমর্থনে এগিয়ে আসছে না মুসলিম বিশ্ব? বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এর পেছনে রয়েছে বহুস্তরীয় রাজনৈতিক, সাম্প্রদায়িক ও কৌশলগত কারণ।
১. শিয়া–সুন্নি বিভাজনের বাস্তবতা
ইরান মূলত শিয়া সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্র—প্রায় ৯০ শতাংশেরও বেশি শিয়া মুসলিম। অন্যদিকে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরশাহি, জর্ডন-সহ অধিকাংশ আরব দেশ সুন্নি নেতৃত্বাধীন। শিয়া–সুন্নি রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা বহু দশকের। আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তার নিয়ে এই দ্বন্দ্বই ইরানকে অনেক সুন্নি দেশের কাছে সন্দেহের চোখে দেখার প্রধান কারণ।

২. ‘প্রক্সি’ রাজনীতি ও জঙ্গিগোষ্ঠী ইস্যু
ইরানের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ—হিজবুল্লা, হামাস, হুতির মতো গোষ্ঠীগুলিকে সমর্থন দিয়ে আঞ্চলিক অস্থিরতা বাড়িয়েছে তেহরান। প্যালেস্তিনিয়ান ইসলামিক জিহাদের ক্ষেত্রেও একই অভিযোগ রয়েছে। অনেক মুসলিম দেশ মনে করে, এই নীতির ফলে মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত দীর্ঘায়িত হয়েছে এবং তার দায় এড়ানো যায় না।
৩. সৌদি–ইরান প্রতিদ্বন্দ্বিতা
Saudi Arabia ও Iran-এর সম্পর্ক ঐতিহাসিকভাবেই টানাপড়েনের। যদিও সাম্প্রতিক কালে চিনের মধ্যস্থতায় সম্পর্ক কিছুটা স্বাভাবিক হয়েছিল, তবু আস্থার ঘাটতি রয়ে গেছে। ইরানের সামরিক পাল্টা হামলায় সৌদি আরব-সহ উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়ায় অনেক আরব দেশ প্রকাশ্যে সমর্থন জানাতে অনিচ্ছুক।
৪. কৌশলগত ভারসাম্য ও মার্কিন সম্পর্ক
উপসাগরীয় বহু দেশই নিরাপত্তা ও অর্থনীতিতে আমেরিকার উপর নির্ভরশীল। প্রকাশ্যে ইরানের পাশে দাঁড়ালে ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি হতে পারে—এই আশঙ্কাও রয়েছে। ফলে তারা সংঘর্ষবিরতির আহ্বান জানালেও সরাসরি সামরিক সহায়তায় যাচ্ছে না।


৫. মুসলিম বিশ্ব লিগের অবস্থান
Muslim World League ইরানের পাল্টা হামলার নিন্দা করেছে। তাদের মতে, আঞ্চলিক স্থিতাবস্থা ও শান্তির জন্য এই ধরনের পদক্ষেপ বিপজ্জনক। অর্থাৎ ধর্মীয় ঐক্যের চেয়ে আঞ্চলিক নিরাপত্তাকেই অগ্রাধিকার দিচ্ছে বহু দেশ।
পাকিস্তান, তুরস্ক ও চিনের ভূমিকা
Pakistan প্রকাশ্যে ইরানের উপর হামলার নিন্দা করলেও সরাসরি সামরিক সহায়তার কথা বলেনি। কূটনৈতিক ভাষায় ‘পাশে থাকার’ বার্তা দিয়েছে, কিন্তু বাস্তব পদক্ষেপে নীরবতা বজায় রেখেছে।

Turkey হামলার নিন্দা করলেও আরব দেশগুলিতে ইরানের পাল্টা আক্রমণেরও সমালোচনা করেছে। অন্যদিকে China সংঘর্ষবিরতির আহ্বান জানিয়েছে, কিন্তু সরাসরি ইরানের পক্ষে অবস্থান নেয়নি।
সব মিলিয়ে স্পষ্ট, বিষয়টি কেবল ধর্মীয় সংহতির নয়; বরং আঞ্চলিক ক্ষমতার ভারসাম্য, নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের জটিল সমীকরণ। মুসলিম বিশ্বে ইরান আজ রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা—এমনটাই মনে করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞরা।








